eNoteShare.com
সারমর্ম - (৫১ থেকে ১০০)
| Article Stats | 💤 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 4,977 words | 28 mins to read |
Total View 32.3K |
|
Last Updated 2 days ago |
Today View 9 |
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।
সকল ক্ষমতা মম করহ ছেদন
দৃঢ় বলে, অন্তরের অন্তর হইতে
প্রভু মোর! বীর্য দেহ সুখেরে সহিতে
সুখেরে কঠিন করি। বীর্য দেহ দুখে
যাহে দুঃখ আপনারে শান্তস্মিত মুখে
পারি উপেক্ষিতে। ভকতিরে বীর্য দেহ
কর্মে যাহে হয় সে সফল, প্রীতি স্নেহ
পুণ্যে উঠে ফুটে। বীর্য দেহ ক্ষুদ্র জনে
না করিতে হীন জ্ঞান, বলের চরণে
না লুটিতে। বীর্য দেহ চিত্তেরে একাকী
প্রত্যহের তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে দিতে রাখি।
বীর্য দেহ তোমার চরণে পাতি শির
অহর্নিশি আপনারে রাখিবারে স্থির।
যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি。
শত কাফনের, শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,
গণিয়া গণিয়া ভুল করে গণি সারা দিনরাত জাগি。
এই মোর হাতে কোদাল ধরি কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নওয়ায়ে চোখের জলে。
মাটিরে আমি যে বড় ভালোবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,
আয়-আয় দাদু, গলাগলি ধরি কেঁদে যদি হয় সুখ।
অর্পণ করেছ নিজে, প্রত্যেকের পরে
দিয়েছ শাসনভার হে রাজাধিরাজ。
সে গুরু সম্মান তব, সে দুরূহ কাজ
নমিয়া তোমারে যেন শিরোধার্য করি
সবিনয়ে, তব কাজে যেন নাহি ডরি
কভু কারে।
তুমিও হওনি সবার মাপে
তুমি সর কারো ঠেলায়
কেউ-বা সরে তোমার চাপে。
তুমি ভেবে দেখতে গেলে
এমনি কিসের টানাটানি,
তেমন করে হাত বাড়ালে
সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি。
আকাশ তবু সুনীল থাকে
মধুর ঠেকে ভোরের আলো
মরণ এলে হঠাৎ দেখি
মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো。
যাহার লাগি চক্ষু বুজে
বহিয়ে দিলাম অশ্রুসাগর
তারে বাদ দিয়েও দেখি
বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর。
মনেরে তাই কহ যে,
ভালো-মন্দ, যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।
পরের দুঃখে কেঁদে কেঁদে যায় শত সুখ পায়ে ঠেলে。
কবি-আরাধ্য প্রকৃতির মাঝে কোথা আছে এর জুড়ি?
অবিচারে মেঘ ঢালে জল, তাও সমুদ্র হতে চুরি。
সৃষ্টির সুখে মহাখুশি যারা তারা নর নহে, জড়;
যারা চিরদিন কেঁদে কাটাইল, তারাই শ্রেষ্ঠতর。
মিথ্যা প্রকৃতি, মিছে আনন্দ, তারাই শ্রেষ্ঠতর。
মিথ্যা প্রকৃতি, মিছে আনন্দ, মিথ্যা রঙ্গিন সুখ;
সত্য সত্য সহস্রগুণ সত্য জীবের সুখ।
জন্মেছিলে একদিন আমারি মতন。
তোমারি এ বায়ুতাপে তাহাদের দেহ
পুষেছিলে পুষিতেছ আমায় যেমন。
জন্মভূমি জননী আমার যেথা তুমি
তাহাদেরও সেই রূপ তুমি মাতৃভূমি。
তোমারি কোলেতে মোর পিতামহগণ
নিদ্রিত আছেন সুখে জীবলীলা শেষে。
তাদের শোণিত অস্থি সকলি এখন
তোমার দেহের সঙ্গে গিয়েছে মা মিশে。
তোমার ধূলিতে গড়া এ দেহ আমার
তোমাদের ধূলিতে কালে মিলাবে আবার।
এমন সাধ্য নাই。
এ সংসারে তোমার আমার
মাঝখানেতে তাই-
কৃপা করে রেখেছ, নাথ,
অনেক ব্যবধান-
দুঃখ-সুখের অনেক বেড়া
ধন জন-মান。
আড়াল থেকে ক্ষণে ক্ষণে
আভাসে দাও দেখা-
কালো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে
রবির মৃদু রেখা。
শক্তি যারে দাও বহিতে
অসীম প্রেমের ভার
একেবারে সকল পর্দা
ঘুচায়ে দাও তার।
দেবগণ। স্বর্গে তোমাদের সুখস্থান,
মোরা পরবাসী। মর্ত্যভূমি স্বর্গ নহে,
সে যে মাতৃভূমি-তাই তার চক্ষে বহে
অশ্রুজলধারা, যদি দু’দিনের পরে
কেহ তারে ছেড়ে যায় দু’ দণ্ডের তরে。
যত ক্ষুদ্র, যত ক্ষীণ, যত অভাজন,
যত পাপীতাপী, মেলি ব্যগ্র আলিঙ্গন。
সবারে কোমল বক্ষে বাঁধিবারে চায়-
ধূলিমাখা তনুস্পর্শে হৃদয় জুড়ায়
জননীর। স্বর্গে তবে বহুক অমৃত,
মর্ত্যে থাক সুখে-দুঃখে অনন্ত মিশ্রিত
প্রেমধারা অশ্রুজলে চিরশ্যাম করি
ভূতলের স্বর্ণখণ্ড-গুলি।
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। যার তরে প্রাণ
কোন ব্যথা নাহি পায়, তার দণ্ডে দান
প্রবলের অত্যাচার। যে দণ্ড বেদনা
পুত্ররে না পার দিতে, সে কারেও দিও না。
যে তোমার পুত্র নহে, তারও পিতা আছে,
মহাঅপরাধী হবে তুমি তার কাছে।
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর,
হে নব সভ্যতা। হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,
দাও সেই তপোবন, পুণ্যছায়া রাশি,
গ্লানিহীন দিনগুলি, সেই সন্ধ্যাস্নান
সেই গোচারণ, সেই শান্ত সামগান,
নীবার-ধান্যের মুষ্টি বল্কল-বসন,
মগ্ন হয়ে আত্মমাঝে নিত্য আলোচন,
মহাতত্ত্বগুলি। পাষাণপিঞ্জরে তব,
নাহি চাহি নিরাপদে রাজভোগ নব。
চাই স্বাধীনতা, চাই পক্ষের বিস্তার
বক্ষে ফিরে পেতে চাই শক্তি আপনার;
পরানে স্পর্শিতে চাই ছিঁড়িয়া বন্ধন,
অনন্ত এ জগতের হৃদয়স্পন্দন।
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার。
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত?
কে আছে জোয়ান হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ。
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।
চক্রসম অন্ধ ধরা চলে।’
সুখী বলে,‘কোথা দুঃখ, অদৃষ্ট কোথায়?
ধরণী নরের পদতলে।’
জ্ঞানী বলে,-‘কার্য আছে, কারণ দুর্জ্ঞেয়;
এ জীবন প্রতীক্ষা কাতর।’
ভক্ত বলে,-‘ধরণীর মহারসে সদা
ক্রীড়ামত্ত রসিক শেখর।’
ঋষি বলে,-‘ধ্রুব তুমি, বরেণ্য ভূমান।’
কবি বলে,-‘তুমি শোভাময়।’
গৃহী আছি,-‘জীবনযুদ্ধে ডাকি হে কাতরে,
দয়াময় হও হে সদয়।’
মাথা উঁচু রাখিস।
সুখের সাথী মুখের পানে যদি না চাহে
ধৈর্য ধরে থাকিস।
রুদ্ররূপে তীব্র দুঃখ যদি আসে নেমে,
বুক ফুলিয়ে দাঁড়াস。
আকাশ যদি বজ্র নিয়ে মাথায় পড়ে ভেঙে
ঊর্ধ্বে দু’হাত বাড়াস।
সোনার ফসল ফলায় যখন পায়ের তলার মাটি
মাটিরই যদি না এ হেন মূল্য মানুষের দাম নেই?
এই সংসারে এই সোজা কথা সব আগে বোঝা চাই。
বিশ্বপিতার মহাকারবার এই দিন দুনিয়াটা,
মানুষই তাহার মহামূল্যধন, কর্ম তাহার খাটা;
তাঁরি নাম নিয়ে খাটিবে যে জন, অন্ন তো তার মুখে,
বিধাতার এই সাচ্চা বান্দা কখনো পড়ে না দুঃখে。
তবে যে একথায় দেখিবারে পাই গরিবের দুর্গতি,
অর্থ তাহার- চেনা না সে তার শক্তির সংহতি।
অসার সংসার চক্র ঘোরে নিরবধি。
দাঁড়াইত স্থিরভাবে, চলিত না হায়
মন্ত্রবলে তুমি চক্র না ঘুরাতে যদি。
ভবিষ্যৎ অন্ধ, মূঢ় মানবসকল
ঘুরিতেছে কর্মক্ষেত্রে বর্তুলাকার,
তব ইন্দ্রজালে মুগ্ধ, পেয়ে তব বল。
বুঝিছে জীবনযুদ্ধে হায় অনির্বার
নাচায় পুতুল যথা দক্ষ বাজিকরে
নাচাও তেমনি তুমি অর্বাচীন নরে।
তাতে যে যেমন ইচ্ছা খাটি。
বসে যদি থাক তবু আগাছায় ধরে কিছু ফুল
হলদে-নীল তারি মধ্যে, রুক্ষ মাটি তবু নয় ভুল
ভুল থেকে সরে সরে অন্য কোন নিয়মের চলা,
কিছু না কিছুর খেলা, থেমে নেই হওয়ার শৃঙ্খলা,
সৃষ্টি মাটি এত মত。
তাইতো আরও বেশি ভাবি
ফলাবো না কেন তবে আশ্চর্যের জীবনের দাবি।
গন্ধ সে চাহে ধুপেরে রহিতে জুড়ে。
সুর আপনারে ধরা দিতে চাহে ছন্দে
ছন্দ ফিরিয়া ছুটে যেতে চায় সুরে。
ভাব পেতে চায় রূপের মাঝারে অঙ্গ,
রূপ পেতে চায় ভাবের মাঝারে ধরা。
অসীম সে চাহে সীমার নিবিড় সঙ্গ,
সীমা চায় হতে অসীমের মাঝে হারা。
প্রলয়ে সৃজনে না জানি এ কার যুক্তি
ভাব হতে রূপে অবিরাম যাওয়া-আসা。
বন্ধ ফিরিছে খুঁজিয়া আপন মুক্তি,
মুক্তি মাগিছে বাঁধনের মাঝে বাসা।
চিরকাল পড়ে রলি চরণের নিচে。
ধূলিকণা কহে, ভাই, কেন কর ঘৃণা?
তোমার দেহের আমি পরিণাম কিনা。
মেঘ বলে সিন্ধু তব জনম বিফল
পিপাসায় দিতে নার এক বিন্দু জল。
সিন্ধু বলে পিতৃনিন্দা কর কোন মুখে?
তুমিও অপেয় হবে পড়িলে এ বুকে।
প্রভু, ক্রীতদাস。
সিন্ধুমূলে জলবিন্দু-বিশ্বমূলে অণু;
সমগ্রে প্রকাশ。
নমি কৃষি তন্তুজীবী স্থপতি, তক্ষক,
কর্ম, চর্মকার。
অদ্রিতলে শিলাখণ্ড- দৃষ্টি অগোচরে
বহু অদ্রি-বার。
কত রাজ্য, কত রাজা গড়িছ নীরবে
হে পূজা, হে প্রিয়。
একত্বে বরেণ্য তুমি, শরণ্য এককে-
আত্মার আত্মীয়।
তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল।
গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান,
কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে করে পরে অন্ন দান।
স্বর্ণ করে নিজ রূপে অপরে শোভিত,
বংশী করে নিজ সুরে অপরে মোহিত。
শস্য জন্মাইয়া নাহি খায় জলধরে
সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত তরে।
পশ্চিমী মজুর। তাহাদেরি ছোট মেয়ে
ঘাটে করে আনাগোনা, কত ঘষামাজা。
ঘটি-বাঁটি-থালা লয়ে আসে ধেয়ে ধেয়ে。
দিবসে শতেক বার পিতল-কঙ্কণ
পিতলের থালি পড়ে বাজে ঠন ঠন。
বড় ব্যস্ত সারাদিন। তারি ছোট ভাই,
নেড়ামাথা, কাদামাথা, গায়ে বস্ত্র নাই,
পোষা পাখিটির মতো পিছে পিছে এসে
বসি থাকে উচ্চ পাড়ে দিদির আদেশে,
স্থির ধৈর্যভরে। ভরা ঘট লয়ে সাথে,
বাম কক্ষে থালি, যায় বালা ডানহাতে
ধরি শিশু কর। জননীর প্রতিনিধি,
কর্মভারে অবনত অতি ছোট দিদি।
অস্থির প্রবাহ করে উভয়ে প্রয়াণ。
ধীরে ধীরে নীরব গমনে গত হয়;
কিবা ধনে, কিবা স্তবনে ক্ষণেক না রয়。
উভয়েই গত হলে আর নাহি ফিরে,
দুস্তর সাগর শেষে গ্রাসে উভয়েরে。
বিফলে বহে না নদী যথা নদী ভরা,
নানা শস্য শিরোরত্নে হাস্যময়ী ধরা。
কিন্তু কাল, সদাত্মা ক্ষেত্রে শোভাকর,
উপেক্ষায় রেখে যায় মরু ঘোরতর।
যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো。
সবাই মোরে ছাড়তে পারে বন্ধু যারা আছে,
নিন্দুক সে ছায়ার মতো থাকবে পাছে পাছে。
বিশ্বজনে নিঃস্ব করে পবিত্রতা আনে,
সাধকজনে নিস্তারিতে তার মতো কে জানে?
বিনামূল্যে ময়লা ধুয়ে করে পরিষ্কার,
বিশ্ব মাঝে এমন দয়াল মিলবে কোথা আর?
নিন্দুক, সে বেঁচে থাকুক বিশ্বহিতের তরে,
আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে।
এ জীবন মন সকলি দাও।
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণেও সুখ,
সুখ সুখ করি কেঁদো না আর;
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে
ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার。
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
পরের ভঙ্গি নকল করে নটের মত কেন চলিস?
তোর নিজস্ব সর্বাঙ্গে তোর দিলেন ধাতা আপন হাতে,
মুছে সেটুকু বাজে হলি, গৌরব কি বাড়ল তাতে?
আপনারে যে ভেঙ্গে চুরে গড়তে চায় পরের ছাঁচে
অলীক, ফাঁকি, মেকি সে জন নামটা তার কদিন বাঁচে?
পরের চুরি ছেড়ে দিয়ে আপন মাঝে ডুবে যা রে,
খাঁটি ধন যা সেথায় পাবি, আর কোথাও পাবি না রে।
নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’
ভাগিনাকে ঢাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কি কথা শুনি।’
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরো হইয়াছে।’
রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায়?’
ভাগিনা বলির, ‘আরে রাম।’
আর কি উড়ে?’‘না’।
‘আর কি গান গায়?’ ‘না?’
‘দানা না পাইলে আর কি চেচাঁয়?’ ‘না’।
রাজা বলিলেন ‘একবার পাখিটাকে আন দেখি।’
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন। সে ‘হাঁ’ করিল না, ‘হুঁ’ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্ খস্ গজ্ গজ্ করিতে লাগিল।
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে。
হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি-তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে。
দেশ-দেশান্তর মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান。
পদে পদে ছোট ছোট নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালো ছেলে করে。
প্রাণ দিয়ে দুঃখ সয়ে. আপনার হাতে
সংগ্রাম করিতে দাও ভালো মন্দ সাথে。
স্বার্থ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া করে。
সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী
রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করো নি।
নতুন নতুন কত গড়ে ইতিহাস-
রক্ত প্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে
সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে。
সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা-
উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা
দোঁহাপানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম。
এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে-
কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে।
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে
কে তুমি
মেলেনি উত্তর。
বৎসর বৎসর চলে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম সাগরতীরে,
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়,
কে তুমি
পেল না উত্তর।
ধরিয়াছে কি আশ্চর্য শোভা মনোহর。
গুণ গুণ গুণ রবে কত মধুকরে,
কেমন পুলকে তারা মধুপান করে,
কিন্তু এরা হারাইবে এ দিন যখন;
আসিবে কি অলি আর করিতে গুঞ্জন
আশায় বঞ্চিত হলে আসিবে না আর,
আর না করিবে এই মধুর ঝংকার;
সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়,
অসময়ে হায় হায় কেহ কারো নয়。
কেবল ঈশ্বর এই বিশ্বপতি যিনি,
সকল সময়ের বন্ধু সকলের তিনি।
সেই বাংলাদেশে শিল্পে, পালা-পার্বণের ঢাকে ঢোলে
আউল বাউল নাচে; পুণ্যাহের সানাই রঞ্জিত
রোদ্দুরে আকাশ-তলে দেখ কারা হাঁটে যায়, মাঝি
পাল তোলে, তাঁতি বোনে, খড়ে-ছাওয়া ঘরের আঙনে
মাঠে-ঘাটে শ্রমসঙ্গী নানা জাতি ধর্মের বসতি
চিরদিন-বাংলাদেশ।
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু。
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু।
কত খোঁড়াখুঁড়ি করে পাই শস্যকণা。
দিতে যদি হয় দে মা প্রসন্ন সহাস,
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস?
বিনা চাষে শস্য দিলে কি তাহাতে ক্ষতি?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কহে বসুমতি-
আমার গৌরব তাতে সামান্যই বাড়ে,
তোমার গৌরব তাহে একেবারে ছাড়ে।
অবিরাম
চালের ডালের তেলের নুনের
হাঁড়ির বাড়ির গাড়ির ছনের。
আলু মাঙ্গা বালু মাঙ্গা,
কাপড় কিনতে লাগে দাঙ্গা,
উঠছে বাজার হু-হু করে সব কিছুর
আঁখের শাকের কাঠের পাটের আম লিচুর。
খাওয়ার জিনিস শোয়ার জিনিস
পরার জিনিস মরার জিনিস
কিছু ছোঁয়ার সাধ্যি নাই。
ঘাটতি কেবল যেদিক চাই。
অভাব শুধু নাই মানুষের
চাই কত মণ, চাই কত সের,
আন্ডা চাও বাচ্চা চাও
জোয়ানে বুড়ো-আসল ফাও
চাহিদা নাই মানুষগুলোর。
কেবলি তার পড়ছে বাজার।
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী-
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তবু
রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;
মন মোর জুড়ে থাকে অতিক্ষুদ্র তারি এককোণ。
সে ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণবৃত্তান্ত আছে যাহে
অক্ষয় উৎসাহে
যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী
কুড়াইয়া আনি。
জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে
পূরণ করিয়া লই যত পারি ভিক্ষালব্ধ ধনে।
নানাভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র。
এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়
পাঠ্য যে সব পাতায় পাতায়
শিখছি সে সব কৌতূহলে সন্দেহ নাই মাত্র।
বিপদে আমি না যেন করি ভয়。
দুঃখ-তাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,
দুঃখ যেন করিতে পারি জয়。
সহায় মোর না যদি জুটে, নিজের বল না যেন টুটে,
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।
অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ। এই বসুধার
মৃত্তিকার পাত্রখানি ভরি বারংবার
তোমা অমৃত ঢালি দিবে অবিরত
নানা বর্ণ গন্ধময়। প্রদীপের মতো。
সমস্ত সংসার মোর লক্ষ বর্তিকায়
জ্বালায়ে তুলিবে আলো তোমারি শিখায়।
বোতাম-আঁটা জামার নিচে শান্তিতে শয়ান。
দেখা হলেই মিষ্ট অতি, মুখের ভাব শিষ্ট অতি,
অলস দেহ ক্লিষ্টগতি, গৃহের প্রতি টান
তৈলঢালা স্নিগ্ধ তনু নিদ্রারসে ভরা,
যেথায় ছোট বহরে বড়ো বাঙালি-সন্তান。
ইহার চেয়ে হতাম যদি আরব বেদুঈন,
চরণতলে বিশাল মরু দিগন্তে বিলীন。
ছুটেছে ঘোড়া উড়েছে বালি, জীবন স্রোতে আকাশ ঢালি,
হৃদয়তলে বহ্নি জ্বালি চলেছি নিশিদিন
বরশা হাতে, ভরসা প্রাণে, সদাই নিরুদ্দেশ
মরুর ঝড় যেমন বহে সকল বাধাহীন।
ভালবাসি তার সব ধূলিবালি মাটি,
আমার প্রাণের সকল অশ্রু নীরে
কেমন করিয়া লাগিল সোনার কাঠি。
অশ্রু-কণা মুক্তার মত জ্বলে
ভরিল হৃদয় আনন্দ কোলাহলে
আলোক আসিয়া হৃদয়ে বাজায় বাঁশী,
সুনীল গগন ভরিয়া উঠিল গানে,
সুন্দর লাগে নয়নে রবির হাসি,
গভীর লাগে নয়নে রবির হাসি,
গভীর হরষ উছসি উঠিছে প্রাণে,
যে দিকে তাকাই পুলকে সকল হিয়া
উঠে শান্তির সংগীতে মুখরিয়া।
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই সূর্যকরে, এই পুষ্পিত কাননে,
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই。
ধরায় প্রাণের লেখা চিরতরঙ্গিত
বিরহ মিলন কত হাসি-অশ্রুময়,
মানবের সুখে-দুঃখে গাহিয়া সঙ্গীত
যদি গো রচিতে পারি অমর আলয়।
হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়,
সেই পথ লক্ষ্য করে, স্বীয় কীর্তিধ্বজা ধরে,
আমরাও হব বরণীয়。
সময় সাগর তীরে, পদাঙ্ক অঙ্কিত করে,
আমরাও হব যে অমর
সেই চিহ্ন লক্ষ্য করে, অন্য কোন জন পরে,
যশোদ্বারে আসিবে সত্বর。
করো না মানবগণ, বৃথা ক্ষয় এ জীবন,
সংসার সমরাঙ্গণ মাঝে,
সংকল্প করেছ যাহা, সাধন করহ তাহা,
ব্রতী হয়ে নিজ নিজ কাজে।
আকস্মাৎ বিভীষিকা সমুদ্রের তরঙ্গে তরঙ্গে
মূর্ছাহত বালুকণা জাগলো কি মৃত্যুর আহ্বান?
অন্ধকারে প্রেতদল পথপাশে অট্টহাসে কেন?
কঙ্কালের শ্বেত নগ্ন অস্থি-গহ্বরে
প্রাণঘাতী বীভৎস রাগিণী?
মৃত্যু-শঙ্কা মূর্চ্ছনা গ্লানি আচ্ছন্ন গগন,
মানুষের দুরাশার অভিযানে টানি দিল ছেদ?
অদৃশ্য আলোর দীপ্তি অজানিত কোন নভস্থলে
সহসা চমকি ওঠে উদ্ভাসিয়া অন্তরের ছায়া?
মরুভূমি পরপারে কোথা স্বর্ণদ্বীপ
প্রলোভন-সব রক্তে ছন্দে দেয় আনি;
তারি পানে উন্মীলিয়া সকল হৃদয়
গোধূলির অন্ধকারে তিমির রাত্রির বক্ষ ভেদি,
পথহীন প্রান্তরে নামহীন বিপদে উত্তরি,
অজ্ঞাত উষার পানে ক্যারাভানের যাত্রা হল শুরু?
চাইনে আমি মানকে-
বরে নেব আমি তোমার
নিবিড় নীরব দানকে。
গভীর রাতের অন্ধকারে
গ্রহ চন্দ্র তারকারে
যে তান দিয়ে হাসায়ে
হাসাতে বিশ্ব-প্রাণকে
প্রাণ আমার জাগাইয়ে
তোল গো সে তানকে-
আড়ম্বরে মত্ত যারা হৃদয়তে অন্ধ
বুঝিবে না তারা আমার নিরিবিলির আনন্দ
শুয়ে ধূলায় পথের পরে
তাকায়ে ওই নীলাম্বরে,
গাহিতে চাই আমি আমার
জগত-জোড়া গানকে-
মান দিও না আমায় তুমি
চাইনে আমি মানকে।
রাবণের চিতাসম যদিও আমার
জ্বলিছে জ্বলুক প্রাণ, কেন এ ক্রন্দন?
অপরের দুঃখ-জ্বালা হবে মিটাইতে
হাসি-আবরণ টানি দুঃখ ভুলে যাও,
জীবনের সর্বস্ব, অশ্রু মুছাইতে
বাসনার স্তর ভাঙ্গি বিশ্বেরে ঢেলে দাও。
হায় হায়, জন্মিয়া যদি না ফুটালে
একটি কুসুমকলি নয়ন-কিরণে,
একটি জীবনব্যথা যদি না জুড়ালে
বুকভরা প্রেম ঢেলে বিফল জীবনে。
আপনা রাখিলে ব্যর্থ জীবন-সাধনা。
জনম বিশ্বের তরে, পরার্থে কামনা।
ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁদিতেছি ডরে。
সংসার বিদায় দিতে, আঁখি ছলছলি
জীবন আঁকড়ি ধরি আপনার বলি
দুই ভুজে。
ওরে মূঢ়, জীবন-সংসার
কে করিয়া রেখেছিল এত আপনার
জনম মুহূর্ত হতে তোমার অজ্ঞাতে
তোমার ইচ্ছার উপর। মৃত্যুর প্রভাতে
সেই অচেনার মুখ হেরিব আবার
মূহূর্তের চেনার মতো। জীবন আমার
এত ভালোবাসি বলে হয়েছে প্রত্যয়,
মৃত্যুরে এমনি ভালোবাসি নিশ্চয়।
আর নাচুক আকাশ শূন্য মাথার পরে,
আসুক জোরে হাওয়া;
এই আকাশ মাটি উঠুক কেঁপে কেঁপে,
শুধু ঝড় বয়ে যাক মরা জীবন ছেপে,
বিজলী দিয়ে হাওয়া。
আয় ভাইবোনেরা ভয় ভাবনাহীন
সেই বিজলী নিয়ে গড়ি নতুন দিন。
আয় অন্ধকারের বদ্ধ দুয়ার খুলে
বুনো হাওয়ার মত আয়রে দুলে দুলে
গেয়ে নতুন গান
যত আবর্জনা উড়িয়ে দেরে দূরে,
আজ মরা গাঙের বুকে নূতন সুরে
ছড়িয়ে দেরে প্রাণ।
তারো মাথায় আছে মণি
বাজা তোর প্রেমের বাঁশি
ভবের বনে ভয় বা কারে?
সবাই যে তোর মায়ের ছেলে
রাখবি কারে, কারে ফেলে?
একই নায়ে সকল ভায়ে
যেতে হবে রে ওপারে।
দরিদ্র সন্তান আমি দীন ধরণীর。
জন্মাবধি যা পেয়েছি সুখ-দুঃখভার。
বহু ভাগ্য বলে তাই করিয়াছি স্থির。
অসীম ঐশ্বর্যরাশি নাই তোর হাতে
হে শ্যামলা সর্বসহা জননী মৃন্ময়ী。
সকলের মুখে অন্ন চাহিস জোগাতে,
পারিস নে কত বার,- কই অন্ন কই
কাঁদে তোর সন্তানেরা ম্লান শুষ্ক মুখ,
জানি মাগো, তোর হাতে সম্পূর্ণ সুখ,
যা-কিছু গড়িয়া দিস ভেঙে ভেঙে যায়,
সব তাতে হাত দেয় মৃত্যু সর্বভুক,
সব আশা মিটাইতে পারিস নে হায়
তা বলে কি ছেড়ে যাব তোর তপ্ত বুক?