eNoteShare.com
সারমর্ম - (১ থেকে ৫০)
| Article Stats | 💤 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 4,766 words | 27 mins to read |
Total View 123.8K |
|
Last Updated 3 days ago |
Today View 5 |
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই প্রীতি নেই করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাঁদের হৃদয়।
উপদেশে কখনও কি সাধু হয় খল?
ভালো মন্দ দোষগুণ আধারেতে ধরে,
ভুজঙ্গ অমৃত খেয়ে গরল উগরে
লবণ জলধি জল করিয়া ভক্ষণ
জলধর করে দেখ সুধা বরিষণ।
সুজনে সু-যশ গায় কু-যশ ঢাকিয়া
কুজনে কু-রব করে সু-রব নাশিয়া।
আপনার ললাটের রতনপ্রদীপ
নাহি জানে, নাহি জানে সূর্যালোকলেশ।
তেমনি আঁধারে আছে এই অন্ধ দেশ।
হে দন্ড-বিধাতা রাজা- যে দীপ্ত রতন
পরায়ে দিয়েছ ভালে তাহার যতন
নাহি জানে, নাহি জানে তোমার আলোক।
নিত্য বহে আপনার অস্তিত্বের শোক,
জনমের গ্লানি। তব আদর্শ মহান
আপনার পরিমাপে করি খান-খান
রেখেছে ধূলিতে। প্রভু, হেরিতে তোমার
তুলিতে হয় মাথা ঊর্ধ্বপানে হায়।
সে এক তরণী লক্ষ লোকের নির্ভর
খন্ড খন্ড করি তারে তরিবে সাগর ?
সর্বদা রসনারাজ্যে বাস করে বাণী।।
ভুবন ভূষিত সদা বক্তৃতার বশে।
পর্বত সলিল হয় রসনার রসে।।
মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে।
অঙ্গীকার অস্বীকার নাহি কোন ক্রমে।
অমৃত নিঃসৃত হয় প্রতি বাক্যে যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর ?
ওষ্ঠে রাঙা হাসির রেখা জীবন জাগে স্পন্দনে।
লক্ষ আশা অন্তরে
ঘুমিয়ে আছে মন্তরে
ঘুমিয়ে আছে বুকের ভাষা পাঁপড়ি পাতার বন্ধনে।
সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটবো মোরা ফুটবো গো,
অরুণ রবির সোনার আলো দু’হাত দিয়ে লুটবো গো।
নিত্য নবীন গৌরবে
ছড়িয়ে দেব সৌরভে,
আকাশ পানে তুলব মাথা, সকল বাঁধন টুটবো গো।
সাগর জলে পাল তুলে দে, কেউবা হবে নিরুদ্দেশ,
কলম্বসের মতই বা কেউ পৌঁছে যাবে নতুন দেশ।
জাগবে সারা বিশ্বময়।
এ বাঙালী নিঃস্ব নয়,
জ্ঞান-গরিমা শক্তি-সাহস আজও এদের হয় নি শেষ।
তোমরা আমাদের মাড়িয়ে
প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,
তারপর ফিরে তাকাও না পিছনের দিকে।
তোমাদের পদধূলিধন্য আমাদের বুক
পদাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় প্রতিদিন।
তোমরাও তা জানো,
তাই কার্পেটে মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত
ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্নকে
আর, চেপে রাখতে চাও পৃথিবীর কাছে
তোমাদের গর্বোদ্ধত অত্যাচারী পদধ্বনি।
তবু আমরা জানি,
চিরকাল আর পৃথিবীর কাছে
চাপা থাকবে না
আমাদের দেহে তোমাদের এই পদাঘাত,
আর, সম্রাট হুমায়ুনের মত
একদিন তোমাদেরও হতে পারে পদস্খলন।
গিরি-গুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত,
সৃজিব জগৎ বিচিত্রতর বীর্যবান,
তাজা জীবন্ত সে নব সৃষ্টি শ্রম-মহান।
চলমান বেগে প্রাণ উচ্ছল
রে নবযুগের স্রষ্টাদল
জোর-কদম চলরে চল।
এই হৃদয়ের সব সৌরভ-বাসনার ব্যঞ্জনা
একাগ্র আর অকুণ্ঠ হয়ে বহু বাতায়ন দ্বারে
আঘাত হেনেছে, পেতেছে দুহাত দুরাশায় বারে বারে।
মেলেনি কিছুই।
বুঝেছি সেদিন মানুষ এমনই দীন,
এ মাটির কাছে আছে আমাদের এমনি অশেষ ঋণ।
অনাদি কালের বন্ধন আর বঞ্চনা একাসনে
চিরজীবনের শৃঙ্খলসম জড়ানো মানব-মনে।
তাই বেদনার বহ্নি ও প্রাণে মাধুর্যে সুনিবিড়,
ঝরা পালকের ভস্মস্তূপে তাই বাঁধিলাম নীড়।
তীক্ষ্ম নখর উদ্যত যার তারে ভালবাসিলাম
দুনয়নে যার হিংস্র আগুন আজো জপি তার নাম।
সকলের সুখ সখা, সুখ শুধু তাই।
আমার একার আলো সে যে অন্ধকার,
যদি না সবারে অংশ দিতে পারি তার।
সকলের সাথে বন্ধু, সকলের সাথে,
যাইব কাহারে বলো, ফেলিয়া পশ্চাতে।
একসাথে বাঁচি আর একসাথে মরি,
এসো বন্ধু, এ জীবন সুমধুর করি।
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে-
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম, ‘সুন্দর’-
সুন্দর হল সে।
তুমি বলবে, এ যে তত্ত্বকথা।
এ কবির বাণী নয়।
আমি বলব এ সত্য,
তাই এ কাব্য।
এ আমার অহংকার,
অহংকার সমস্ত মানুষের হয়ে।
মানুষের অহংকার-পটেই
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প।
যে গেছে বুকেতে আঘাত হানিয়া তার লাগি আমি কাঁদি।
যে মোরে দিয়েছে বিষে ভরা বাণ,
আমি দেই তারে বুকভরা গান;
কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনমভর
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
মুকুতা-মাণিক্য-নিধি
আমারে দিও না বিধি
চাহিনে এ জগতে রাজত্ব সম্মান।
বাঞ্ছিত পরাণ পেলে
মেগে নেব মনুষ্যত্ব শ্রেষ্ঠ উপাদান
প্রাণের সাধক আমি, সাধনীয় প্রাণ।
অথবা দিনের শেষে কোন নীল আকাশের পাখি,
আমি যেন ছোট নদী বুকভরা ছোট ছোট ঢেউ,
সে নদীতে স্নান করে গাঁয়ের মেয়েরা কেউ কেউ।
আমি যেন কোন এক পথশ্রান্ত অচেনা পথিক,
দুদণ্ড তাকিয়ে থাকি যে-আকাশ আলো ঝিকমিক,
আমি যেন কত বন, কত মেঘ, বালুতীর,
অথবা অনেক রাতে একমুঠো চাঁদের আবির।
যুগে যুগে যারা করে অকারণ বিপ্লব-অভিযান
জীবনের আতিশয্যে যাহারা দারুণ উগ্র সুখে
সাধ করে নিল গরল-পিয়ালা, বর্শা হানিল বুকে।
আষাঢ়ের গিরি-নিঃস্রাব-সম কোন বাধা মানিল না,
বর্বর বলি যাহাদের গালি পাড়িল ক্ষুদ্রমনা,
কূপ-মন্ডুক ‘অসংযমী’র আখ্যা দিয়াছে যারে।
তারি তরে ভাই গান রচে যাই, বন্দনা করি তারে।
ফুল এবং পাখিকে চিনি
সামান্য স্তন্যপ্রায়ী থেকে
বহুভোজী বহু প্রাণী চিনি;
শ্রমে প্রেমে ক্রোধে প্রতিশোধে
মানুষের মত কেউ নয়।
গড়ে ওঠে অরণ্যভোগী লোকালয়
-মানুষের শ্রমে,
গড়ে ওঠে মধুকুঞ্জ বংশধারা
মানুষের প্রেমে কামে,
জ্বলে ওঠে দাবানল
-মানুষের ক্রোধে,
লোকালয় অরণ্য হয়
-মানুষের ঘৃণায়, প্রতিশোধে।
অবিশ্রান্ত; একে একে হয় জড়ো,
এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।
তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।
দিনে দিনে বহু বাড়িতেছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ।
হাতুড়ি, শাবল, গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দুপাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমাদের সেবিতে হইল যাহারা মজুর,মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি,
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদের গান
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান।
স্বজাতি হইয়া থাকি সর্বলোক সনে
দেশে দেশান্তরে; উষ্ট্রদুগ্ধ করি পান
মরুতে মানুষ হই আরব সন্তান
দুর্দম স্বাধীন, তিব্বতের গিরিতটে
নির্লিপ্ত প্রস্তুরপুরী মাঝে, বৌদ্ধ মঠে
করি বিচরণ। দ্রাক্ষাপায়ী পারসিক
গোলাপ কাননবাসী তাতার নির্ভীক
অশ্বারূঢ়, শিষ্টাচারী সতেজ জাপান
প্রবীণ প্রাচীন চীন নিশি দিনমান
কর্ম-অনুরত,-সকলের ঘরে ঘরে
জন্মলাভ করে লই হেন ইচ্ছা করে।
সুখ-দুঃখ সমভাগ করে নেব সকলে ভাই,
নাই অধিকার সঞ্চয়ের।
কারো আঁখি জলে কারো ঝাড়ে কিরে জ্বলিবে দীপ?
দু’জনার হবে বুলন্দ নসীব, লাখে লাখে হবে বদ নসীব।
এ নহে বিধান ইসলামের।
ঈদ-উল-ফিতর আনিয়াছে তাই নব বিধান,
ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা তা কর দান,
ক্ষুধার অন্ন হোক সবার।
ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে
তৃষাতুরের হিসসা আছে ও- পেয়ালাতে
দিয়া ভোগ কর, বীর, দেদার।
কি কর চাতক ভায়া ধূলি মাঝে থাকি।
কোথায় উঠেছি চেয়ে দেখ একবার
এখানে আসিতে পার সাধ্য কি তোমার।
চাতক কহিছে, তবু নিচে দৃষ্টি তব,
গদা ভাব কার কিবা ছোঁ মারিয়া লব।
মেঘ বারি ভিন্ন অম্ল জল নাহি খাই,
তাই আমি নিচে থেকে ঊর্ধ্বমুখে চাই।
উচ্চ হোক তুচ্ছ হোক দূরে কিংবা থাক তাহা কাছে,
পাত্র বা অপাত্র হোক, প্রেমেই প্রেমের সার্থকতা;
বিশ্বজয়ী প্রেম কভু বিশ্ব মাঝে জানে না ব্যর্থতা।
প্রেমিকের অশ্রুজলে মন্দাকিনী চির-প্রবাহিত,
প্রণয়ীর দীর্ঘশ্বাসে স্বর্গে গিয়া হয় সে বঞ্চিত,
সত্যের নিষ্ফল-প্রেম স্বর্গে গিয়া হয় সে সফল,
নন্দন-মান্দারে রয় প্রণয়ের পরিমল।”
দূর করে দাও তুমি সব তুচ্ছ ভয়
লোকভয়, রাজভয়, মৃত্যুভয় আর
দীনপ্রাণ দুর্বলের এ পাষাণভার,
এই চিরপেষণযন্ত্রণা, ধূলিতলে
এই নিত্য অবনতি, দন্ডে গলে পরে
এই আত্ম-অবমান, অন্তরে বাহিরে
এই দাসত্বের রজ্জু, ত্রস্ত নত শিরে
সহস্রের পদপ্রান্ততলে বারংবার
মনুষ্য-মর্যাদা-গর্ব চির পরিহার
এ বৃহৎ লজ্জারাশি চরণ আঘাতে
চূর্ণ করি দূর করো। মঙ্গলপ্রভাতে
মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে
উদার আলোক-মাঝে, উন্মুক্ত বাতাসে।
দিতে হবে ভাষা, এই-সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে
ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা; ডাকিয়া বলিতে হবে-
‘মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে;
যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা-চেয়ে,
যখনি জাগিবে তুমি সম্মুখে তাহার তখনি সে
পথকুক্কুরের মত সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে।
দেবতা বিমুখ তারে, কেহ নাহি সহায় তাহার;
মুখে করে আস্ফালন, জানে সে হীনতা আপনার
মনে মনে।
দহিল হৃদয় মন সেই ক্ষোভানলে।
ধীরে ধীরে চুপি চুপি দুঃখাকুল মনে,
গেলাম ভজনালয়ে ভজন কারণে।
সেথা দেখি একজন পদ নাহি তার,
অমনি জুতার খেদ ঘুচিল আমার।
পরের দুঃখের কথা করিলে চিন্তন,
আপনার মনে দুঃখ থাকে কতক্ষণ?
আগন্তুক! রূপের দুর্লভ সত্তা লভিয়া বসেছ
সূর্য-নক্ষত্রের সাথে। দূর আকাশর ছায়াপথে
যে আলোক আসে নামি ধরণীর শ্যামল ললাটে
সে তোমার চক্ষু চুম্বি তোমারে বেঁধেছে অনুক্ষণ
সখ্যডোরে দ্যুলোকের সাথে; যুগ-যুগান্তর হতে
মহাকালযাত্রী মহাবাণী পুণ্য মুহূর্তের তব
শুভক্ষণে দিয়াছে সম্মান; তোমার সম্মুখ দিকে
আত্মার যাত্রার পন্থ গেছে চলি অনন্তের পানে-
সেথা তুমি এক যাত্রী অফুরন্ত এ মহাবিস্ময়।
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাবো- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি,
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
কৃষক বালা আসছে ফিরে পুকুর হতে কলসী পুরে।
ওই কুঁড়েঘর উহার মাঝেই যে চিরসুখ বিরাজ করে,
নাইরে সে সুখ অট্টালিকায়, নাইরে সে সুখ রাজার ঘরে।
কত গভীর তৃপ্তি যে লুকিয়ে আছে পল্লীপ্রাণে,
জানুক কেহ নাই- বা জানুক সে কথা মোর মনই জানে
মায়ের গোপন বিত্ত যা তার খোঁজ পেয়েছে ওরাই কিছু
মোদের মত তাই ওরা আর ছুটে নাকো মোহের পিছু।
ঠগে ঠগে হল আমাদের কত গ্রাম উজাড়
কত বুলবুলি খেল কত ধান-
কত মা গাইল বর্গীর গান-
তবু বেঁচে থাকে অমর প্রাণ-
এ জনতার-
কৃষাণ, কুমোর, জেলে, মাঝি, তাঁতি আর কামার,
অমর দেশের মাটিতে মানুষ তাদের প্রাণ-
মূঢ় মৃত্যুর মুখে জাগে তাই কঠিন গান।
তবে তাই লয়ে সাথে, তবে তাই করো আজি দান।
বড়ো দুঃখ বড়ো ব্যথা - সম্মুখে কষ্টের সংসার
বড়ই দরিদ্র, শূন্য বড় ক্ষুদ্র, বদ্ধ, অন্ধকার।
অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু,
চাই বল, চাই স্বাস্থ্য আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু,
সাহস বিস্তৃত বক্ষপট। এ দৈন্য-মাঝারে, কবি,
একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি।
‘গৃহ তেয়াগিব আমি ইষ্ট-দেব লাগি।
কে আমারে ভুলাইয়া রেখেছে এখানে!”
দেবতা কহিলা, “আমি।” শুনিল না কানে。
সুপ্তিমগ্ন শয্যার প্রান্তে ঘুমাইছে সুখে।
কহিল, “কে তোরা, ওরে মায়ার ছলনা।”
দেবতা কহিলা, “আমি”। কেহ শুনিল না。
ডাকিল শয়ন ছাড়ি, “তুমি কোথা প্রভু!”
দেবতা কহিলা, “হেথা”। শুনিল না তবু。
স্বপনে কাঁদিল শিশু জননীরে টানি,
দেবতা কহিলা, “ফির”। শুনিল না বাণী。
দেবতা নিঃশ্বাস ছাড়ি কহিলেন, “হায়,
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়!”
মাঠ ভারে দেই আমি কত শস্য ফল;
পর্বত দাঁড়ায়ে রহে কি জানি কি কাজ
পাষাণের সিংহাসনে তিনি মহারাজ।
বিধাতার অবিচারে কেন উঁচু নিচু,
সে কথা বুঝিতে আমি নাহি পারি কিছু।
গিরি কহে, “সব হলে সমভূমি পারা
নামিত কি ঝরনার সুমঙ্গল ধারা?”
হাস্যমুখে অদৃষ্টের করব মোরা পরিহাস।
রিক্ত যারা সর্বহারা, সর্বজয়ী বিশ্বে তারা,
গর্বময়ী ভাগ্যদেবীর নয়কো তারা ক্রীতদাস।
হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস।
আমরা সুখের স্ফীত বুকের ছায়ার তলে নাহি চরি।
আমরা দুঃখের বক্রমুখের চক্র দেখে ভয় না করি।
ভগ্ন ঢাকে যথাসাধ্য বাজিয়ে যাব জয়বাদ্য,
ছিন্ন আশার ধ্বজা তুলে ভিন্ন করব নীলাকাশ।
হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস।।
সমস্ত পৃথিবী চলিতেছে যতদূর
শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর,
‘যেতে আমি দেব না তোমায়।’ ধরণীর
প্রান্ত হতে নীলাভ্রের সর্বপ্রান্ততীর
ধ্বনিতেছে চিরকাল অনাদ্যন্ত রবে,
‘যেতে নাহি দিব; যেতে নাহি দিব।’ সবে
কহে, ‘যেতে নাহি দিব।’ তৃণ ক্ষুদ্র অতি,
তাঁরেও বাঁধিয়া বক্ষে মাতা বসুমতী
কহিছেন প্রাণপণে, ‘যেতে নাহি দিব।’
আয়ুক্ষীণ দীপমুখে শিখা নিব-নিব,-
আঁধারে গ্রাস হতে কে টানিছে তারে,
কহিতেছে শতবার, ‘যেতে দিব নারে।’
এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত্য ছেয়ে
সবচেয়ে পুরাতন কথা, সবচেয়ে
গভীর ক্রন্দন, ‘যেতে নাহি দিব।’ হায়,
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।
কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফুটে বিষ লেগে গেল তায়।
ঘরে ফিরে এসে রাত্রে বেচারা বিষম ব্যথায় জাগে,
মেয়েটি তাহার, তারি সাথে হায়., জাগে শিয়রের আগে।
বাপেরে সে বলে ভর্ৎসনা ছলে কপালে রাখিয়া হাত,
তুমি কেন বাবা ছেড়ে দিলে তারে, তোমার কি নেই দাঁত?
কষ্টে হাসিয়া আর্ত কহিল, “তুইরে হাসালি মোরে,
দাঁত আছে বলে কুকুরে গায়ে দংশি কেমন করে?
কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, কামড় দিয়েছে পায়,
তা’বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে মানুষের শোভা পায়?
শুচিতা ফিরিছে সাদা তোমারি পিছনে।
তুমি আছ, গৃহবাসে তাই আছে রুচি,
নইলে মানুষ বুঝি ফিরে যেত বনে।
শিশুজ্ঞানে সেবা তুমি করিতেছ সবে,
ঘুচাইছ রাত্রিদিন সর্ব ক্লেদ গ্লানি।
ঘৃণার নাহিক কিছু স্নেহের মানবে,
হে বন্ধু, তুমিই একা জেনেছ সে বাণী।
নির্বিচারে আবর্জনা বহু অহর্নিশ
নির্বিকার সদা শুচি তুমি গঙ্গাজল।
নীলকণ্ঠ করেছেন পৃত্বীবে নির্বিষ।
আর তুমি? তুমি তারে করেছ নির্মল।
এস বন্ধু, এস বীর, শক্তি দাও চিতে
কল্যাণের কর্ম করি লাঞ্ছনা সহিতে।
কে তুমি ফিরিছ বন জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?
হায় ঋষি দরবেশ,
বুকের মানিককে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ দেশ।
সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,
স্রষ্টারে খোঁজো আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে।
ইচ্ছা-অন্ধ। আঁখি খোলো, দেখ দর্পণে নিজ কায়া,
দেখিবে তোমারি সব অবয়বে পড়েছে তাঁহার ছায়া।
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি,
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি।
মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেতে সুরাসুর।
রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনই পুড়িতে হয়।
প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরস্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুঁড়েঘরে।
নিয়ে চল আলো অভিসারে।
পৃথিবীর অধিকার-বঞ্চিত যে ভিক্ষুকের দল-,
জীবনের বন্যাবেগে তাদের কর বিচঞ্চল। অসত্য অন্যায়
যত ডুবে থাক, সত্যের প্রসাদ
পিয়ে লভ অমৃতের স্বাদ।
অজস্র মৃত্যুরে লঙ্ঘি হে নবীন, চল অনায়াসে
মৃত্যুঞ্জয়ী জীবন-উল্লাসে।
হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা।
তোমার আদেশ, যেন রসনায় মম
সত্য বাক্য জ্বলি উঠে খর খড়গ সম।
তোমার বিচারাসনে লয়ে নিজ স্থান।
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।
সরল মাহাত্ম্য লয়ে সহজে বিরাজে;
পূরবের নব সূর্য, নিশীথের শশী
তৃণটি তাদেরি সাথে একাসনে বসি。
আমার এ গান এও জগতের গানে
মিশে যায় নিখিলের মর্ম মাঝখানে;
শ্রাবণের ধারাপাত, বনের মর্মর
সকলের মাঝে তার আপনার ঘর。
কিন্তু হে বিলাসী, তব ঐশ্বর্যের ভার。
ক্ষুদ্র রুদ্ধ দ্বারে শুধু একাকী তোমার।
কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে।
দুই তীরে দুই গ্রাম আছে জানাশোনা,
সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা।
পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব, কত সর্বনাশ,
নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস-
রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে
সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে!
সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা
উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা!
শুধু হেথা দুই তীরে, কেবা জানে নাম,
দোঁহাপানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম।
এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে-
কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে।
আমি চেয়েছিনু ক্ষুধার অন্ন, তুমি কর নাই দান।
মানুষ বলিবে, তুমি জগতের প্রভু,
আমরা তোমারে কেমনে খাওয়াব, সে কাজ কী হয় কভু?
বলিবেন খোদা-ক্ষুধিত বান্দা গিয়াছিল তব দ্বারে
মোর কাছে তুমি ফিরে পেতে তাহা যদি খাওয়াইতে তারে।
ধরণীর হাতে দিল যারা জানি ফসলের ফরমান।
শ্রম-কিণাঙ্ক কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে
ত্রস্তা ধরণী নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে-ফলে।
বন্য-শ্বাপদ-সঙ্কুল জরা-মৃত্যু-ভীষণ ধরা
যাদের শাসনে হল সুন্দর কুসুমিতা মনোহারা।
হেরিব না দিক-
গণিব না দিনক্ষণ, করিব না বিতর্ক বিচার-
উদ্দাম পথিক।
মুহূর্তে করিব পান মৃত্যুর ফেনিল উন্মত্ততা
উপকণ্ঠ ভরি –
খিন্ন শীর্ণ জীবনের শত লক্ষ ধিক্কার লাঞ্ছনা
উৎসর্জন করি।
গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।
মুহূর্তে নিমেষ কাল, তুচ্ছ পরিমাণ,
গড়ে যুগ যুগান্তর-অনন্ত মহান।
প্রত্যেক সামান্য ত্রুটি, ক্ষুদ্র অপরাধ,
ক্রমে টানে পাপপথে, ঘটায় প্রমাদ।
প্রিত করুণার দান, স্নেহপূর্ণ বাণী,
এ ধারায় স্বর্গসুখ নিত্য দেয় আনি।
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।
কোন্ রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোন কালে একা হয়নিক জয়ী পুরুষের তরবারী,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষ্মী নারী।
হাঁটিতে শিখে না কেহ না খেয়ে আছাড়,
সাঁতার শিখতে হলে
আগে তবে নাম জলে,
আছাড়ে করিয়া হেলা হাঁট বার বার
পারিব বলিয়া সুখে হও আগুসর।
মানুষে করিছে ক্ষুদ্র, বিষাইছে বিশ্বের আকাশ,
মানবতা মহাধর্ম রোধ করি করিছে উল্লাস
বর্বরের হিংস্র নীতি, ঘৃণা দেয় বিকৃত নির্দেশ।
জাতি-ধর্ম-দেশ উর্ধ্বে ঘৃণা উর্ধ্বে পাচ্ছ যেই দেশ,
সেথায় সকলে এক, সেথায় মুক্ত সত্যের প্রকাশ,
মানবসভ্যতা সেই মুক্ত সত্য লভুক বিকাশ,
মহৎ সে মুক্তি-সংজ্ঞা মঙ্গল সে নির্বার অশেষ।
জাতি-ধর্ম-রাষ্ট্র ন্যায় সকলি যে মানুষের তরে
মানুষ সবার উর্ধ্বে নহে কিছু তাহার অধিক।
জানি হে, জানি তাও হয়নি হারা।
যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে
যে নদী মরুপথে হারালো ধারা
জানি হে, জানি তাও হয়নি হারা।
জীবনে আজো যারা রয়েছে পিছে
জানি হে, জানি তাও হয়নি মিছে
আমার অনাগত আমার অনাহত
তোমার বীণাতারে বাজিছে তারা
জানি হে, জানি তাও হয়নি হারা।
দুপুরের মিহি ঘুম ছিঁড়ে কুঁড়ে গেল :
জেগে দেখি আমি
আমার ঘরেতে ওড়ে ছোট এক বুনো মৌমাছি,
ডানায় ডানায় যার সোঁদাগন্ধ অজানা বনের।
কেমন সুন্দর ওই উড়ন্ত মৌমাছি।
অশ্রান্ত করুণ ওর গুণগুণানিতে
কেঁপে ওঠে মাটির মসৃণতম গান,
আর দূর পাহাড়ের বন্ধুর বিষন্ন প্রতিধ্বনি।
যেন আজ বাহিরের সমস্ত পৃথিবীর আর সমস্ত আকাশ
আমার ঘরের মাঝে তুলে নিয়ে এল
কোথাকার ছোট এক বুনো মৌমাছি।
tnx
Very good
অনেক উপকৃত হলাম
Onek onek opukar hoice.Thanks a lot❤️🥰
Valo laglo abong onek upkaro hlolo. Thanks🥰
খুব ভালো লাগলো