eNoteShare.com
সারমর্ম - (১০১ থেকে ১৫০)
| Article Stats | 💤 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 4,428 words | 25 mins to read |
Total View 29.8K |
|
Last Updated 2 days ago |
Today View 0 |
সেই খানে যে চরণ তোমার রাজে
সবার পিছে, সবার নীচে, সব হারাদের মাঝে。
যখন তোমায় প্রণাম করি আমি
প্রণাম আমার কোনখানে যায় থামি
তোমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে
সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে。
অহংকার তো পায় না নাগাল যেথায় তুমি ফের
রক্ত-ভূষণ দীনদরিদ্র সাজে
সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে。
ধনে মানে যেথায় আছে ভরি
সেথায় আমার সঙ্গ আশা করি
সঙ্গী হয়ে আছে যেথায় সঙ্গীহীনের ঘরে
সেথায় তোমার হৃদয় নামে, না যে
সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে।
সহস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে।
যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার。
সর্বজন সর্বক্ষণ চলে সেই পথে
তৃণ গুল্ম সেথা নাহি জন্মে কোন মতে。
যে জাতি চলে না কভু, তারি পথ পরে
তন্ত্র-মন্ত্র-সংহিতায় চরণ না সরে।
বিভক্ত এ মানুষ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত
যুদ্ধ মারামারি হানাহানি সবই আছে জানি
তারপরও এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ
এতো প্রগতির পদক্ষেপ সভ্যতার
পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে সারা বিশ্বময়
ওরা বলছে আমরা মানুষ আছি এভাবে
জগত জুড়ে প্রীতির বন্ধন আর স্বভাবে।
ঘৃণ্য যম-দূত-সেনা এড়িয়ে সীমান্তপারে ছোটে,
পথে পথে অনশনে অন্তিম যন্ত্রণা রোগে ত্রাসে
সহস্রের অবসান, হন্তারক বারুদে বন্দুকে
মূর্ছিত-মৃতের দেহ বিদ্ধ করে, হত্যাব্যবসায়ী
বাংলাদেশ ধ্বংস-কাব্যে জানে না পৌঁছল জাহান্নামে
এ জন্মেই;
বাংলাদেশ অনন্ত অক্ষত মূর্তি জাগে।
দরিয়া-অথৈ ভ্রান্তি নিয়াছি তুলে,
আমাদেরি ভুলে পানির কিনারে মুসাফির দল বসি
দেখেছে সভয়ে অস্ত গিয়াছে তাদের সেতারা, শশী।
আমরা যে কালো, তুমি ভালো জান, নহে তাহা অপরাধ。
তুমি বলো নাই। শুধু শ্বেত দ্বীপে
জোগাইবে আলো রবি-শশী-দীপে
সাদা রবে সবাকার টুটি টিপে, এ নহে তব বিধান。
সন্তান তব করিতেছে আজ তোমার অসম্মান।
জীবনে তাহার কভু মূর্খতা না ঘোচে。
চৈত্র মাসে চাষ দিয়া না বোনে বৈশাখে,
কবে সেই হৈমন্তিক ধান্য পেয়ে থাকে?
সময় ছাড়িয়া দিয়া করে পণ্ডশ্রম,
ফল চাহে, সেও অতি নির্বোধ অধম。
খেয়াতরী চলে গেলে বসে থাকে তীরে。
কিসে পার হবে, তরী না আসিলে ফিরে?
চেয়ে চেয়ে দেখতে ভালোবাসি。
ব্যস্ত হয়ে ওরা টিকেট কিনে,
ভাটির ট্রেনে কেউবা চড়ে, কেউবা উজান ট্রেনে。
সকাল বেলা কেউবা থাকে বসে,
কেউবা গাড়ি ফেল করে তার শেষ মিনিটের দোষে。
দিনরাত গড় গড় ঘড় ঘড়。
গাড়িভরা মানুষের ছোটে ঝড়。
ঘন ঘন গতি তার ঘুরবে
কভু পশ্চিমে কভু পুবে।
তার কোনো পরিমাপ নাই বাহিরের দেশে কালে
সে অন্তরময়。
অন্তর মিলালে পরে তার অন্তরের পরিচয়。
পাইনে সর্বত্র তার প্রবেশের দ্বার,
বাধা হয়ে আছে মোর বেড়াগুলি জীবনযাত্রার。
চাষী ক্ষেত্রে চালাইছে হাল,
তাঁতী বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল,
বহুদুর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার
তারি পরে ভর দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার。
প্রতি ক্ষুদ্র অংশে তার সম্মানের চিরনির্বাসনে
সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসেছি সংকীর্ণ বাতায়নে。
মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে,
ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে。
জীবনে জীবন যোগ করা
না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।
দেশ-মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা。
দধীচি কি তাহার চেয়ে সাধক ছিল বড়?
পুণ্য অত হবে না’ক সব করিলেও জড়。
মুক্তিকামী মহাসাধক, মুক্ত কর দেশ,
সবারই সে অন্ন যোগায়, নাইকো গর্ব লেশ。
ব্রত তাহার পরের হিত সুখ নাহি চায় নিজে
রৌদ্র-দাহে তপ্ত তনু শুকায় মেঘে ভিজে。
আমার দেশের মাটির ছেলে, করি নমস্কার,
তোমায় দেখে চূর্ণ হউক সকল অহংকার।
সেই ঘর মরি খুঁজিয়া
দেশে দেশে মোর দেশ আছে, আমি
সেই দেশ লব বুঝিয়া。
পরবাসী আমি যে দুয়ারে চাই
তার মাঝে মোর আছে যেই ঠাঁই,
কোথা দিয়া সেথা প্রবেশিতে পাই,
সন্ধান লব বুঝিয়া;
ঘরে ঘরে আছে পরম আত্মীয়,
তারে আমি ফিরি খুঁজিয়া।
নইলে মনের কালি মুছবে না রে。
আজ তোর যাহা ভালো
ফুলের মত দে সবারে。
করে তুই আপন আসন,
হারালি যা ছিল আপন,
এবার তোর ভরা আপন
বিলিয়ে দে তুই যারে তারে。
যারে তুই ভাবিস ফণী
তারো মাথায় আছে মণি
বাজা তোর প্রেমের বাঁশি
ভবের বনে ভয় বা কারে?
সবাই যে তোর মায়ের ছেলে
রাখবি কারে, কারে ফেলে?
একই নায়ে সকল ভায়ে
যেতে হবে রে ওপারে।
সংসারে গড়িব এক নতুন সমাজ。
মানুষের সাথে কভু মানুষের রবে না বিচ্ছেদ-
সর্বত্র মৈত্রীর ভাব করিবে বিরাজ。
দেশে দেশে যুগে যুগে কত যুদ্ধ কত না সংঘাত
মানুষে মানুষে হলো কত হানাহানি。
এবার মোদের পুণ্যে সমুদিবে প্রেমের প্রভাত
সোল্লাসে গাহিবে সবে সৌহার্দ্যের বাণী।
চলিতে দীঘির কিনারে কাঁপিছে জানু গিরি তৃণবন。
ঘুমের নিভৃতে নিঃশ্বাস পড়ে, হংস ফিরিছে ঘরে。
শাবকেরা তার ঘিরিয়া চলেছে, ডানা হতে জল ঝরে。
সহসা শুনিনু কর্ণ তুলিয়া হংস কহিছে ডাকি,
‘চক্ষুতে ধরা রেখেছে যে ধরি, আমারি মত সে পাখি,
মরাল সেজন মরণ রহিত রহে সে গগন পরে
পাখা ঝাড়িলে সে বৃষ্টি পড়ে গো, চাহিতে জ্যোৎস্না ঝরে।’
আগুবাড়ি যাই, শুনিবারে পাই- পদ্ম কহিছে সরে。
‘সৃজন পালন করে যে, আপনি আছে সে বৃন্ত ভরে。
আপনার ছাঁচে মোরে সে গড়েছে, ‘জগৎ’ যাহারে বলে
সে তো সেই মহাপদ্মের দলে হিমকণা টলটলে।’
না হয় উদয়,
তারকার পুঞ্জ যদি নিভে যায় প্রলয় জলদে
না করিব ভয়。
হিংস্র ঊর্মি ফণা তুলি, বিভীষিকা-মূর্তি ধরি যদি
গ্রাসিবারে আসে,
সে মৃত্যু লঙ্ঘিয়া যাব সিন্ধুপারে নবজীবনের
নবীন আশ্বাসে।
সাত সাগরে ভাসবে আমার সপ্ত মধুকর。
আমার ঘাটের সওদা নিয়ে যাবে দূরের ঘাটে,
চলবে আমার বেচাকেনা বিশ্ব জোড়া হাটে,
ময়ুরপঙ্খি বজরা আমার সাতখানা পাল তুলে
ঢেউয়ের দোলায় মরাল-সম চলবে দুলে দুলে。
সিন্ধু আমার বন্ধু হবে, রতন মানিক তার
আমার তরী বোঝাই দিতে আনবে উপহার。
দ্বীপে দ্বীপে আমার আশায় জাগবে বাতিঘর,
শুক্তি দিবে মুক্তা মালা, প্রবাল দেবে কর。
আমায় ঘিরে সিন্ধু শকুন করবে এসে ভিড়,
হাতছানিতে ডাকবে আমার নতুন দেশের তীর।
সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে।।
জানি না তোর ধন-রতন আছে কিনা রাণীর মতন
শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।।
কোন বনেতে জানিনে ফুল গন্ধে এমন করে আকুল
কোন গগনে উঠেরে চাঁদ এমন হাসি হেসে。
আঁখি মেলে তোমার আলো প্রথম আমার চোখ জুড়ালো,
ওই আলোতেই নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে।।
সুখের আলো জ্বলে বুকে দুঃখের ছায়া নাশে。
স্বাধীনতা সোনার কাঠি খোদার সুধা দান,
স্পর্শে তাহার নেচে উঠে শূন্য দেহে প্রাণ。
মনুষ্যত্বের বান ডেকে যায় যাহার হৃদয়তলে,
বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় ভীরু স্বাধীনতার বলে।
রচি গৃহ হাসি মুখে ফিরে সন্ধ্যাবেলা。
জননীর অঙ্কোপরে প্রাতে ফিরে আসি,
হেরে তার গৃহখানি কোথা গেছে ভাসি。
আবার গাড়িতে বসে সেই তার খেলা,
ভাঙা আর গড়া নিয়ে কাটে তার বেলা。
এই সে খেলা- হায়, এর আছে কিছু মানে?
যে জন খেলায় খেলে- সেই বুঝি জানে।
ভাঙাগড়া চলছে অনুক্ষণ,
পাখি জনম, শাখি জনম হতে,
রাখছ কথা, শুনছ নিবেদন。
আজ কি হঠাৎ নিষ্ঠুর তুমি হবে?
কান্না শুনে নীরব হয়ে রবে?
এমন কভু হয় না, তোমার ভবে
মনে-মনে বলছে আমার মন।
যুগে যুগে সংহারের আঘাতে তাদের হয়েছে লয়。
কাঠ না পুড়ায়ে আগুন জ্বালাবে বলে কোন অজ্ঞান?
বনস্পতি ছায়া পাবে বীজ নাহি দিলে তার প্রাণ?
তলোয়ার রেখে খাপে এরা, ঘোড়া রাখিয়া আস্তাবলে
রণজয়ী হবে দন্তবিহীন বৈদান্তিকী ছলে!
প্রাণ-প্রবাহের প্রবল বন্যা বেয়ে খরস্রোতা নদী
ভেঙ্গেছে দুকূল; সাথে সাথে ফুল ফুটায়েছে নিরবধি。
জলধর মহা-তৃষ্ণা জাগিয়েছে যে বিপুল নদীস্রোতে
সে কি দেখে, তাঁর স্রোতে কে ডুবিল, কে মরিল তার পথে?
মানে না বারণ, ভরা যৌবন শক্তি-প্রবাহ ধায়
আনন্দ তার মরণ-ছন্দে কূলে কূলে উথলায়।
অসীম ক্ষমতা তার অতুল সম্মান,
হউক বিভব তার সম সিন্ধু জল,
হউক প্রতিভার তার অক্ষুণ্ণ উজ্জ্বল。
হউক তার বাস রম্যহর্ম্য মাঝে,
থাকুক সে মণিময় মহামূল্য সাজে。
কিন্তু সে সাধে কি কভু জন্মভূমি হিত,
স্বজাতির সেবা যেবা করেনি কিঞ্চিৎ。
জানাও সে নরাধমে জানাও সত্বর,
অতীব ঘৃণিত সে পাষণ্ড বর্বর।
একটি কুসুম নয়ন কিরণে
একটি জীবনব্যথা যদি না জুড়ালে
বুকভরা প্রেম ঢেলে বিফল জীবনে
আপনারে রাখিলে ব্যর্থ জীবন-সাধনা
জনম বিশ্বের তরে পরার্থে কামনা।
বুকের মানিককে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ?
সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুজে,
স্রষ্টারে খোঁজ-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে。
ইচ্ছা-অন্ধ ! আঁখি খোলো, দেখ দর্পণে নিজ কায়া,
দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে পড়েছে তাঁহার ছায়া。
শিহরি উঠো না, শাস্ত্রবিদদের করো নাক বীর ভয়-
তাহারা খোদার খোদ প্রাইভেট সেক্রেটারি তা নয়!
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!
হাস্য করে অর্ধজীবন করেছি তো অপচয়。
চলে যারে সুখের রাজ্য, দুঃখের রাজ্য নেমে আয়,
গলা ধরে কাঁদতে শিখি গভীর সমবেদনায়。
সুখের সঙ্গ ছেড়ে করি দুঃখের সঙ্গে বসবাস,
ইহাই আমার ব্রত হউক, ইহাই আমার অভিলাষ。
যেথায় ক্লান্তি, যেথায় ব্যাধি, যন্ত্রণা ও অশ্রুজল,
ওরে তোরা হাতটি ধরে আমায় সেথায় নিয়ে চল。
পরের দুঃখে কাঁদতে শেখা- তাহাই শুধু চরম নয়,
মহৎ দেখে কাঁদতে জানা- তবেই কাঁদা ধন্য হয়।
বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”
কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি-
“দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি?
বাতাবি নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?
দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?”
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি。
পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে
মাতৃভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে।
এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো
পদ-লালিত্য ঝংকার মুছে যাক,
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো。
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়-
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
জাগার গানে,
তোমার শিখাটি উঠুক জ্বলিয়া
সবার প্রাণে。
ছায়া ফেলিয়াছে প্রলয়ের নিশা,
আঁধারে ধরণী হারায়েছে দিশা
তুমি দাও বুকে অমৃতের তৃষা
আলোর ধ্যানে。
ধ্বংস-তিলক আঁকে চক্রীরা
বিশ্ব-ভালে;
হৃদয়-ধর্ম বাঁধা পড়ি ফাঁদে
স্বার্থ-জালে,
মৃত্যু জ্বালিছে জীবন-মশাল,
চমকিছে মেঘে খর তরবার,
বাজুক তোমার মন্ত্র ভয়াল
বজ্র-তানে।
শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম-নগরের ভিড়ে,
এখানে মৃত্যু হানা দেয় বার বার,
লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার。
এই যে আকাশ, দিগন্ত মাঠ, স্বপ্নে সবুজ মাটি
নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি,
কোথাও নেইকো পার
মারি ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার
আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল,
এখানে চরম দুঃখে কেটেছে সর্বনাশের খাল,
ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটাতে জমেছে নির্জনতার কালো,
হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান
কণ্টক মুকুট শোভা, দিয়াছ তাপস,
অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার,
বীণা মোর শাপে তব হল তরবার。
দুঃসহ দাহনে তব হে দর্প তাপস,
অম্লান স্বর্গেরে মোর করিলে বিরস,
অকালে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ。
শীর্ণ করপুট ভরি সুন্দরের দান
যতবার নিতে যাই হে বুভুক্ষু, তুমি
অগ্রে আসি, কর পান। শূন্য মরুভূমি
হেরি মম কল্পলোক।
অপমান হতে হবে তাদের সবার সমান。
মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,
অপমান হতে হবে তাদের সবার সমান。
মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে。
বিধাতার রুদ্র রোষে দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান。
অপমানে হতে হবে তাদের সবার সমান।
কহিলাম, “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”
কহিল সে কাছে সরে আসি-
“কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
গিয়াছে চলিয়া ধীর পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে! তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোন মতে।”
নিদ্রিত আছেন সুখে জীবনলীলা-শেষে
তাদেরও শোণিত অস্থি সকলি এখন
তোমারি দেহের সঙ্গে গিয়েছে মা মিশে
তোমার ধূলিতে গড়া এ দেহ আমার
তোমার ধূলিতে কালে মিলাবে আবার
ফল আস্বাদনে পায় আনন্দ প্রচুর。
বিদায়ের কালে হাতে ডাল ভেঙে লয়,
তরু তবু অকাতরে কিছু নাহি কয়。
দুর্লভ মানবজন্ম পেয়েছ যখন
তরুর আদর্শ কর জীবনে গ্রহণ。
পরার্থে আপন সুখ দিয়ে বিসর্জন,
তুমিও হও গো ধন্য তরুর মতন।
বিশাল বটের তলে ভূমিতে লুটায়。
বট বলে, ‘ছায়াময় বাহু প্রসারিয়া
আশ্রয় দিয়াছি তোমারে করুণা করিয়া,
নতুবা তপন-তাপে শুষ্ক হত দেহ।’
লতা বলে, ‘ফিরে লহ অযাচিত স্নেহ
তোমার করুণা মম হইয়াছে কাল,
রৌদ্র বিনা হয়ে আছি বিশীর্ণ কঙ্কাল।’
হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা
তোমার আদেশে। যেন রসনায় মম
সত্যবাক্য জ্বলি ওঠে খরখড়্গ সম
তোমার ইঙ্গিতে। যেন রাখি তব মান
তোমার বিচারাসনে লয়ে নিজ স্থান。
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে।
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে。
চলে যেতে হবে আমাদের。
চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া,
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু ॥
দহিল হৃদয় মম সেই ক্ষোভানলে。
ধীরে ধীরে চুপি চুপি দুঃখাকুল মনে
গেলাম ভজনালয়ে ভজন কারণে。
দেখি সেথা এক জন পদ নাহি তার
অমনি জুতার খেদ ঘুচিল আমার。
পরের দুঃখের কথা করিলে চিন্তন
আপনার মনে দুঃখ থাকে কতক্ষণ।
সুখের আলো জ্বালে বুকে, দুঃখের ছায়া নাশে。
স্বাধীনতা সোনার কাঠি, খোদার সুধা দান
স্পর্শে তাহার নেচে উঠে শূন্য দেহে প্রাণ。
মনুষ্যত্বের বান ডেকে যায়, পশুর হৃদয়তলে
বুক ফুলায়ে দাঁড়ায় ভীরু স্বাধীনতার বলে。
দর্পভরে পদানত উচ্চ করে শির,
শক্তিহীনেও স্বাধীনতা আখ্যাদানে বীর।
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়
পাহাড়-কাটা সে পথের দুপাশে পড়িয়া যাদের হাড়
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি
তোমারে সেবিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান
তাদেরই ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান।
কত খোঁড়াখুঁড়ি করে পাই শস্য কণা。
দিতে যদি হয় দে মা, প্রসন্ন সহাস-
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস?
বিনা চাষে শস্য দিলে কি তাহাতে ক্ষতি?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতি,
আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,
তোমার গৌরব তাহে একেবারে ছাড়ে।
জীবনে তাহার কভু মূর্খতা না ঘোচে。
চৈত্র মাসে চাষ দিয়া না বোনে বৈশাখে
কবে সেই হৈমন্তিক ধান্য পেয়ে থাকে?
সময় ছাড়িয়া দিয়া করে পণ্ডশ্রম,
ফল চাহে সেও অতি নির্বোধ অধম。
খেয়াতরী চলে গেলে বসে থাকে তীরে,
কিসে পার হবে তারা না আসিলে ফিরে॥
সংসারে গড়িব এক নতুন সমাজ。
মানুষের সাথে কভু মানুষের রবে না বিচ্ছেদ-
সর্বত্র মৈত্রীর ভাব করিবে বিরাজ。
দেশে দেশে যুগে যুগে কত যুদ্ধ কত না সংঘাত
মানুষে মানুষে হল কত হানাহানি。
এবার মোদের পুণ্যের সমুদিবে প্রেমের প্রভাত
সোল্লাসে গাহিবে সবে সৌহার্দ্যের বাণী।
যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো。
সবাই মোরে ছাড়তে পারে বন্ধু যারা আছে,
নিন্দুক সে ছায়ার মত থাকবে পাছে পাছে。
বিশ্বজনে নিঃস্ব করে, পবিত্রতা আনে,
সাধক জনে নিস্তারিতে তার মত কে জানে?
বিনামূল্যে ময়লা ধুয়ে করে পরিষ্কার,
বিশ্ব মাঝে এমন দয়াল মিলবে কোথা আর?
নিন্দুক সে বেঁচে থাকুক বিশ্ব-হিতের তরে,
আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে।
গিরি-গুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত
সৃজিব জগৎ বিচিত্রতর, বীর্যবান
তাজা জীবন্ত সে সব সৃষ্টি শ্রম-মহান
চলমান বেগে প্রাণ উচ্ছল。
রে সব যুগের স্রষ্টাদল
জোর-কদম চল্ রে চল্।
হেরিব না দিক-
গণিব না দিনক্ষণ, করিব না বিতর্ক বিচার-
উদ্দাম পথিক。
মুহূর্তে করিব পান মৃত্যুর ফেনিল উন্মত্ততা
উপকণ্ঠ ভরি-
খিন্ন শীর্ণ জীবনের শত লক্ষ ধিক্কার লাঞ্ছনা
উৎসর্জন করি।
তোমরা আমাদের মাড়িয়ে
প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,
তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে
তোমাদের পদধূলিধন্য আমাদের বুক
পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় প্রতিদিন。
তোমরাও তা জানো
তাই কার্পেটে মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত
ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্নকে
আর চেপে রাখতে চাও পৃথিবীর কাছে
তোমাদের গর্বোদ্ধত, অত্যাচারী পদধ্বনি。
তবু আমরা জানি
চিরকাল আর পৃথিবীর কাছে
চাপা থাকবে না
আমাদের দেহে তোমাদের এই পদাঘাত。
আর সম্রাট হুমায়ুনের মতো
একদিন তোমাদেরও হতে পারে পদস্খলন॥
অস্থির প্রবাহে করে উভয়ে প্রয়াণ。
ধীরে ধীরে গমনে গত হয়
কিবা ধনে, কিবা স্তবনে ক্ষণেক না রয়。
উভয়েই গত হলে আর নাহি ফিরে
দুস্তর সাগর শেষে গ্রাসে উভয়েরে。
বিফলে বহে না নদী যথা নদী ভরা
নানা শস্য শিরোরত্নে হাস্যময়ী ধরা。
কিন্তু কাল, সদাত্মা ক্ষেত্রে শোভাকর
উপেক্ষায় রেখে যায় মরু ঘোরতর।
অসাধারণ 👌