eNoteShare.com
বিদায় অনুষ্ঠানে বিদায় দেওয়া শিক্ষার্থীর ভাষণ
| Article Stats | 💤 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 926 words | 6 mins to read |
Total View 6 |
|
Last Updated 17 hours ago |
Today View 5 |
আজকের এই বিষাদঘন, অশ্রুসিক্ত বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত সম্মানিত সভাপতি, আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক (বা অধ্যক্ষ) মহোদয়, স্নেহময় শিক্ষকমণ্ডলী, আমার সামনে উপবিষ্ট আমার স্নেহের সহপাঠী ও অনুজরা, এবং যাঁদের উদ্দেশ্যে আজকের এই আয়োজন—আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়, ভালোবাসার বিদায়ী বড় ভাই ও বোনেরা। সবাইকে জানাই আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে সশ্রদ্ধ সালাম, আসসালামু আলাইকুম এবং বিষণ্ণ বিকালের শুভেচ্ছা।
আজকের এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন। কারণ, আজ এমন একটি দিন, যে দিনটির কথা আমরা কেউই ভাবতে চাইনি, অথচ নিয়তির অমোঘ নিয়মে দিনটি আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আজ আমাদের বুকটা ভারী হয়ে আছে, চোখের কোণে জমেছে না-বলা অনেক কথার জল। মনের ভেতর আজ কেবলই বেজে চলেছে বিদায়ের এক করুণ সুর। কবিগুরুর ভাষায় বলতে হয়—
"যেতে নাহি দিব হায়,
তবু যেতে দিতে হয়,
তবু চলে যায়।"
শ্রদ্ধেয় অগ্রজরা, আপনারা আজ আমাদের ছেড়ে, এই প্রাণের বিদ্যাপীঠ ছেড়ে জীবনের এক নতুন ধাপে, এক বৃহত্তর পরিসরে পা রাখতে যাচ্ছেন। সামনে আপনাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই পরীক্ষা কেবল একটি সার্টিফিকেট অর্জনের পরীক্ষা নয়, এটি আপনাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের এক বিশাল দরজা। আমরা জানি, সময়ের স্রোত কখনো থেমে থাকে না। ঘড়ির কাঁটা তার আপন নিয়মেই ঘোরে। তবুও আজ বড্ড ইচ্ছে করছে, সময়টাকে যদি একটু আটকে রাখা যেত! যদি আপনাদের সাথে কাটানো সোনালি দিনগুলো আরেকটু দীর্ঘায়িত করা যেত!
আজকের এই বিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে আমার বারবার মনে পড়ছে সেই দিনগুলোর কথা, যখন আমরা প্রথম এই ক্যাম্পাসে পা রেখেছিলাম। সবকিছু ছিল অচেনা, অজানা। বুক দুরুদুরু ভয়ে যখন আমরা ক্লাসরুমে ঢুকেছি, তখন আপনারাই তো পরম মমতায় আমাদের হাত ধরেছিলেন। আপনারা শুধু আমাদের সিনিয়র ছিলেন না, আপনারা ছিলেন আমাদের অভিভাবক, আমাদের বড় ভাই, আমাদের বড় বোন।
হঠাৎ করেই বেজে উঠল, বিদায়ের করুণ সুর,
স্মৃতির পাতায় জমল এসে, একরাশ রোদ্দুর।
যেতে নাহি চায় মন, তবু যেতে দিতে হয়,
নিয়তির এই নির্মম নিয়মে, আজ বড্ড পরাজয়।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এই বিদ্যাপীঠের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি ইট-পাথর আপনাদের পদচারণায় মুখরিত ছিল। ওই যে স্কুলের বিশাল মাঠ, যেখানে আপনারা ঘাম ঝরিয়েছেন; ওই যে করিডোর, যেখানে টিফিনের অবসরে আপনাদের হাসির শব্দে চারপাশ মেতে উঠত; ওই যে লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরি—সবখানেই আপনাদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কাল সকালে যখন আমরা এই ক্যাম্পাসে আসব, তখন আপনাদের সেই পরিচিত মুখগুলো আর দেখতে পাব না। আপনাদের সেই আড্ডা, সেই প্রাণোচ্ছল হাসি, আমাদের শাসন করা, আদর করা—সবকিছুই কাল থেকে কেবল স্মৃতি হয়ে যাবে। ভাবতেই আমাদের বুকটা শূন্যতায় হাহাকার করে উঠছে।
আপনারা ছিলেন আমাদের আকাশের ধ্রুবতারা। যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা কিংবা বিজ্ঞান মেলা—সবকিছুতেই আপনারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আপনাদের দেখেই আমরা শিখেছি কীভাবে দায়িত্ব নিতে হয়, কীভাবে একসাথে কাজ করতে হয়, কীভাবে নিজের প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসতে হয়। আপনাদের সেই শূন্যস্থান পূরণ করা আমাদের জন্য কতটা কঠিন হবে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা আপনাদের ছায়ায় ছিলাম এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। আজ সেই বটবৃক্ষের ছায়া যেন আমাদের ওপর থেকে সরে যাচ্ছে।
বিদায়—মাত্র তিনটি অক্ষরের একটি ছোট্ট শব্দ। কিন্তু এর ওজন যেন হিমালয় পর্বতের চেয়েও ভারী। এর গভীরতা যেন প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়েও বেশি। বিদায় মানেই এক অদ্ভুত কষ্ট, এক নীল বেদনা। আজ আপনাদের বিদায় দিতে গিয়ে আমাদের হৃদয় চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তবু, চোখের জল লুকিয়ে আমাদের হাসিমুখে আপনাদের বিদায় জানাতে হচ্ছে। কারণ, আমরা জানি, আপনাদের এই প্রস্থান কোনো পলায়ন নয়, এটি হলো নবীন জীবনের আবাহন।
আজ কেন মন কাঁদে, বিদায়ের এই ক্ষণে,
স্মৃতিরা সব ভিড় করেছে, হৃদয়ের গহিনে।
তোমাদের ওই হাসিমুখ, মনে পড়বে রোজ,
কে নেবে আর আমাদের, নিত্যদিনের খোঁজ?
শ্রদ্ধেয় বিদায়ী ভাই ও বোনেরা, চলার পথে, একসাথে থাকতে গিয়ে মানুষ মাত্রই ভুল হয়। আমরা আপনাদের ছোট ভাই-বোন। বয়সের দোষে, না-বুঝার কারণে কিংবা কখনো কখনো নিছক দুষ্টুমি করতে গিয়ে আমরা হয়তো আপনাদের অনেক বিরক্ত করেছি। হয়তো কখনো আপনাদের কথার অবাধ্য হয়েছি, আপনাদের মনে কষ্ট দিয়েছি। ছোট ভাই-বোন হিসেবে আমাদের অনেক আবদার ছিল আপনাদের কাছে, কখনো হয়তো সেই আবদার করতে গিয়ে সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছি। আজকের এই বিদায়বেলায়, আপনাদের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ—আমাদের সকল ভুল-ত্রুটি, সব অন্যায় আপনারা বড় মনের গুণে ক্ষমা করে দেবেন। আমাদের প্রতি কোনো রাগ বা অভিমান আপনারা বুকে পুষে রাখবেন না। আপনাদের ক্ষমার দৃষ্টি আমাদের আগামী দিনের পথচলাকে আরও সুন্দর ও মসৃণ করবে।
সামনে আপনাদের জীবনের অন্যতম বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষা আপনাদের ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। আমরা, আপনাদের অনুজরা, আজ দু'হাত তুলে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছি—তিনি যেন আপনাদের সহায় হন। আপনারা যেন আপনাদের মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেদের সেরা ফলাফল অর্জন করতে পারেন। আপনাদের সাফল্যই আমাদের অহংকার। আমরা বিশ্বাস করি, আপনারা যেখানেই যাবেন, যে প্রাঙ্গণেই পা রাখবেন, নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে এই প্রতিষ্ঠানের নামকে আরও উজ্জ্বল করবেন।
জীবন নদীর স্রোতের মতো। সে কেবলই সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আপনারা আজ একটি ছোট নদী থেকে বিশাল মোহনায়, এক উন্মুক্ত সাগরে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। সেখানে নতুন বন্ধু হবে, নতুন পরিবেশ হবে, নতুন অনেক ব্যস্ততা আসবে। কিন্তু আমাদের একটাই চাওয়া—আপনারা যেন আপনাদের এই ফেলে যাওয়া অতীতকে ভুলে না যান। এই ক্যাম্পাস, এই শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং আপনাদের এই ছোট ভাই-বোনদের কথা যেন আপনাদের স্মৃতির মণিকোঠায় চিরকাল সযতনে থাকে।
যেখানেই থাকো, ভালো থেকো, রেখো এই আঙিনা মনে,
তোমাদের স্মৃতি অমলিন রবে, আমাদের প্রতি ক্ষণে।
নতুন দিনের নতুন সূর্য, আনুক তোমার জয়,
তোমাদের তরে আমাদের এই, অন্তহীন প্রণয়।
পরিশেষে বলতে চাই, বিদায় মানেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া নয়। বিদায় মানে নতুন এক শুরুর প্রতীক্ষা। আমরা জানি, এই প্রতিষ্ঠানের সাথে আপনাদের নাড়ির টান কখনোই ছিন্ন হওয়ার নয়। যখনই সময় পাবেন, ফিরে আসবেন আপনাদের এই পুরোনো ঠিকানায়। আমরা আপনাদের অপেক্ষায় থাকব।
আপনাদের আগামী দিনগুলো হোক অনেক বেশি সুন্দর, অনেক বেশি সফল আর আনন্দময়। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, আর স্বপ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠুন। আপনাদের জন্য রইল এক আকাশ সমান ভালোবাসা, এক সমুদ্র পরিমাণ শ্রদ্ধা আর অন্তহীন শুভকামনা।
সবাইকে আবারো ধন্যবাদ জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি।
আল্লাহ হাফেজ। আসসালামু আলাইকুম।
Comments (0)