eNoteShare.com
প্রবন্ধ রচনা : দুর্নীতি ও তার প্রতিকার (40+ Points)
| Article Stats | 📡 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 1,163 words | 7 mins to read |
Total View 7 |
|
Last Updated 8 hours ago |
Today View 6 |
ভূমিকা
দুর্নীতি কখনো হয় না সুনীতি,
এ এক ভয়ানক মানসিক ব্যাধি।
যার মনোরাজ্যে বিচরণ করছে এ ব্যাধি,
তার ইহকাল-পরকাল নিয়ে কেবলই আমরা কাঁদি। — ফিরোজ খান
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম হয়েছে যে সার্বভৌম দেশের, সে দেশটির নাম বাংলাদেশ। এদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ, তবুও এদেশ নানা সমস্যার ভারে জর্জরিত। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো দুর্নীতি। বর্তমানে এ সমস্যা আমাদের জাতীয় জীবনকে রাহুগ্রাসের মতো আকড়ে ধরেছে। এ অবস্থা কারো কাম্য নয়। তাই বাংলাদেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের সচেতন হওয়া আশু জরুরি এবং দুর্নীতির সব ক্ষেত্রের মূল উৎপাটন করা দরকার।
দুর্নীতির সংজ্ঞা
নীতি শব্দের আগে 'দুঃ' উপসর্গ যুক্ত হয়ে 'দুর্নীতি' শব্দটি গঠিত হয়েছে। শাব্দিক অর্থে যা নীতি সমর্থিত নয়, তাই দুর্নীতি। আরও পরিষ্কারভাবে বলা যায়, মানুষ যখন স্বেচ্ছাচারিতার প্রকাশ ঘটিয়ে অন্যায়ভাবে নীতি লঙ্ঘন করে কোনো কাজ করে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করে, তখন তাকে দুর্নীতি বলে। দুর্নীতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী Pamnuth বলেন—
In corruption, a person willfully neglects his specified duty in order to have an undue advantage.
অর্থাৎ, দুর্নীতি হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য ক্ষমতা বা প্রভাবের অবৈধ ও স্বার্থপ্রণোদিত ব্যবহার।
সমাজ ও জাতীয় জীবনে দুর্নীতির প্রভাব
সমাজজীবনে দুর্নীতির প্রভাব মারাত্মক। দুর্নীতি সমাজে সম্পদের অসম প্রবাহ সৃষ্টি করে এবং শ্রেণি বৈষম্য বৃদ্ধি করে। কালো টাকার প্রভাবে একশ্রেণির মানুষ রাতারাতি ধনী বনে যায় এবং অসত্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে সমাজের সৎ মানুষেরা। শুধু তাই নয়, দুর্নীতি প্রসারে নৈতিকতার অপমৃত্যু ঘটে এবং সমাজ থেকে সৎ, সুন্দর ও কল্যাণচেতনা নির্বাসিত হয়।
দুর্নীতি ও বর্তমান বিশ্ব
সৃষ্টির সেরা জীব হলো মানুষ। স্বার্থপরতা নয়, মানবতাই মানুষের মূল ধর্ম। দুর্নীতি সাময়িক ব্যক্তিগত উন্নয়ন আনলেও তা রাহুর মতো সমাজকে গ্রাস করে। দেশ ও সমাজ থেকে দুর্নীতিকে বিদায় করে সুন্দর পৃথিবী গড়ার দায়িত্ব মানুষের। দুর্নীতিতে ডুবে যাওয়া দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে যুগে যুগে বহু মনীষীকে আমরণ সংগ্রাম করতে হয়েছে। ব্যক্তি-সুখ বিসর্জন দিয়ে সুন্দর মানবজীবন গড়ে তুলতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মতো শত শত মহামানবের জন্ম হয়েছে।
বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা
গত ৩৫ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ পরপর কয়েকবার বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে দুর্নীতির সূচকের জন্য। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআই (Transparency International) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টগুলোতে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিচিতি বিশ্বসভায় আমাদের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে দুর্নীতির বিভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে—
- প্রশাসনিক ক্ষেত্র: বর্তমানে বাংলাদেশের কোনো সরকারি দপ্তর বা বিভাগই দুর্নীতিমুক্ত নয়। ঘুষ বা উৎকোচ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অপচয় ও চুরি ইত্যাদির মাধ্যমে প্রশাসনে ব্যাপকহারে দুর্নীতি হয়। বাইবেলের ২৩ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, "তোমরা ঘুষ গ্রহণ করবে না, কারণ ঘুষ বুদ্ধিমানকে অন্ধ করে এবং ধার্মিকদের ন্যায়বিচার বিপবিত্ত করে।"
- রাজনৈতিক ক্ষেত্রে: রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বর্তমানে ব্যাপকহারে দুর্নীতি চলছে। রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ক্ষমতায় থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যায়ভাবে নিজের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। কবির ভাষায়—
সুন্দর বাগান সবার মনে আছে,
ফুটাতে সবাই তাহা পারে না। - অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে: ব্যবসায়ী মহল কর্তৃক মজুতদারির মাধ্যমে বাজারদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া—সহ নানা উপায়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকে দুর্নীতি গ্রাস করে ফেলেছে। পবিত্র কুরআনে অন্যকে অন্যায়ভাবে অর্থ গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
- শিক্ষাক্ষেত্রে: পরীক্ষায় ব্যাপক নকলের প্রবণতা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ক্লাসে ভালোভাবে না পড়িয়ে প্রাইভেট টিউশনিতে বাধ্য করা এবং নিয়মিত ক্লাসে না আসা।
- সরকারি সেবা সংস্থার দুর্নীতি: সরকারি সেবা খাতগুলো দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছে। ঘুষ ছাড়া এখন আর কোনো কাজই করা যায় না। এ প্রসঙ্গে ত্রিপিটকে বলা হয়েছে— ঘুষ গ্রহণ করো না, কাউকে ঠকাবে না এবং অসৎ কাজ করবে না।
- বেসরকারি খাতে: শুধু সরকারি খাতে নয়, বেসরকারি খাতেও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার নামে সরকারি সুবিধা ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে সে টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। কর ও শুল্ক ফাঁকি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ইত্যাদি এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- জাতীয় অর্থনীতিতে ক্ষতি: সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে দেশের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতে বাংলাদেশে অবৈধ আয়ের পরিমাণ মোট জাতীয় আয়ের শতকরা ৩০ থেকে ৩৪ ভাগ হবে।
জাতীয় উন্নয়নে দুর্নীতির প্রভাব
- দুর্নীতি ও জাতীয় উন্নয়ন: দুর্নীতির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকারি খাতের জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়া। যে অর্থ উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করার কথা, তা চলে যায় দুর্নীতিবাজ আমলা ও শাসকগোষ্ঠীর পকেটে।
- দুর্নীতি ও প্রবৃদ্ধি: দুর্নীতি বাংলাদেশের উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। দেশীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাত যেমন— কৃষি, শিল্প, ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক খাতের দুর্নীতি দেশজ উৎপাদনকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
- দুর্নীতি ও দারিদ্র্য বিমোচন: দুর্নীতি ও দারিদ্র্য আমাদের জাতীয় জীবনের দুটি প্রধান সমস্যা। দারিদ্র্য অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে সহায়তা করে, আবার দুর্নীতির ফলেই আমরা দারিদ্র্যের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না।
- দুর্নীতি ও মানব উন্নয়ন: জাতীয় উন্নয়নের জন্য মানব উন্নয়ন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক নয়, যার জন্য মূলত দুর্নীতিই দায়ী।
দুর্নীতির কারণসমূহ
- ঐতিহাসিক কারণ: বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে দুর্নীতি চলে আসছে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে বিদেশি শাসকেরা নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য এ দেশে একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ আমলার মাধ্যমে জনগণকে শোষণ করত। পরবর্তীতে বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও এর বিস্তার ঘটেছে।
- আর্থিক অসচ্ছলতা: আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বিভিন্ন পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ সমাজে সৎ উপায়ে মৌল চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, ফলে দুর্নীতির প্রসার ঘটে।
- রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা: রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভে নির্বাচনে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ভোটারদের প্রভাবিত করা হয়, যা দুর্নীতির বিস্তার ঘটায়। উচ্চাভিলাষ ও রাতারাতি ধনী হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও এর অন্যতম কারণ।
- বেকারত্ব: ভয়াবহ বেকারত্বের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সমাজে দুর্নীতি প্রসারিত হয়।
- অপর্যাপ্ত বেতন কাঠামো: কর্মজীবী মানুষদের বেতন ও পারিশ্রমিক চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত হওয়ায় তারা বিকল্প উপায়ে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে।
- জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব: সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা এবং কঠোর জবাবদিহিতার অভাব দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে।
- দুর্নীতি দমনে বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অভাব: প্রচলিত আইনকানুন ও শাস্তিদানের প্রক্রিয়ায় ফাঁকফোকর থাকায় প্রশাসন অনেক সময় দুর্বল ভূমিকা পালন করে।
- মুদ্রাস্ফীতি বা অর্থের মূল্যস্তর বৃদ্ধি: মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে সমাজে অসৎ ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দুর্নীতি করার সুযোগ পায়।
- আইনের শাসন ও দায়িত্বে অবহেলা: আইনের স্পষ্টতার অভাব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যের অনৈতিকতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে দুর্নীতি পাকাপোক্ত রূপ নেয়।
- তথ্য অধিকারের অভাব: সরকারের কর্মকাণ্ডের তথ্য জনগণের জানার সুযোগ সীমিত থাকলে দুর্নীতি অবাধে চলতে পারে।
দুর্নীতি প্রতিরোধের উপায়
- স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন: দুর্নীতি দমনে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।
- ন্যায়পালের পদ বাস্তবায়ন: দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের জন্য সংবিধানে বর্ণিত 'ন্যায়পাল'-এর পদ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
- স্বাধীন নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা: বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: 'কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়'—এই বোধে সবাইকে উজ্জীবিত করে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
- সরকারি নিরীক্ষণ কমিটি গঠন: সরকারি হিসাব ও কাজের অডিট বা নিরীক্ষা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
- পর্যাপ্ত বেতন ও পারিশ্রমিক প্রদান: বাজারমূল্যের সাথে সমন্বয় করে সুষম বেতন কাঠামো এবং পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা উচিত।
- রাজনৈতিক সদিচ্ছা: রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সদিচ্ছার মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
- কার্যকর সংসদ: সংসদের সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
- প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: প্রশাসনকে জনমুখী ও স্বচ্ছ করে সততাকে উৎসাহিত করতে হবে।
- দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি: গণসচেতনতা বৃদ্ধি করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
- গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকা: সমাজে দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য সাহসিকতার সাথে প্রকাশ করে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উপসংহার
উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক জীবনের সর্বাংশে আজ দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। দুর্নীতির কালো হাত সমাজজীবনের সকল দিককে গ্রাস করেছে। দুর্নীতি বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। তাই সর্বত্রই উচ্চারিত হোক আমাদের স্লোগান— "ঘুষ নেব না, ঘুষ দেব না, কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না।"
Comments (0)