eNoteShare.com

প্রবন্ধ রচনা : দুর্নীতি ও তার প্রতিকার

Article Stats 📡 Page Views
Reading Effort
898 words | 5 mins to read
Total View
112K
Last Updated
12-Feb-2026 | 05:48 PM
Today View
1

↬ দুর্নীতি : উন্নয়নের অন্তরায়

↬ দুর্নীতি ও বাংলাদেশ


ভূমিকা : বাংলাদেশে যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে দুর্নীতি বোধ হয় সবচেয়ে মারাত্মক- কারণ এই ব্যাধি সানসিক এবং তা সারানো খুব সহজ নয়। দুর্নীতিই আজ এক শ্রেণীর মানুষের কাছে নীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে, সমাজের একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত দুর্নীতি তার থাবা বিস্তার করেছে। এ অবস্থায় জাতীয় উন্নয়নে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত না হয়ে পারে না।

দুর্নীতির সর্বগ্রাসী রূপ : বাংলাদেশ সীমাহীন দুর্নীতির আবর্তে নিমজ্জিত। সে দুর্নীতির অবস্থান দেখা যায় সর্বত্র। ঋণ নিয়ে বেমালুম হজম করে ফেলা, সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করা, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস চুরি, আয়কর-বিক্রয়কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া, চাকরির নামে হায় হায় কোম্পানি খোলা, হীনস্বার্থে শেয়ার-বাজার কারচুপি, চোরাচালানি, কালোবাজারি, ওভার ইনভয়েস, আন্ডার ইনভয়েস- দুর্নীতি কোথায় নেই? এমনকী দুঃস্থ মায়েদের জন্যে বরাদ্ধকৃত গম নিয়ে, এতিমখানার এতিমদের জন্যে বরাদ্দকৃত বস্ত্র নিয়ে, দুর্গত মানুষের জন্যে বরাদ্দকৃত ত্রাণের টিন নিয়েও দুর্নীতি হয়েছে। পরীক্ষার হলেও দুর্নীতি আধিপত্য বিস্তার করছে। ভাবা যায় না, মেধা তালিকায় স্থান নির্ধারণেও চলে দুর্নীতি। সরকার দুর্নীতি দমন সংস্থা করেছেন দুর্নীতি সামাল দিতে। কিন্তু বিগত সরকারগুলোর আমলে দেখা যায়, দুর্নীতির ভূত সেখানেও আছর গেড়েছে। অসহায় মানুষ সেখানে ন্যায় বিচার আশা করে, সেই বিচার ব্যবস্থায় আইনের শাসনের হাত-পা ভেঙে দিয়েছে দুর্নীতি। দুর্নীতির সর্বগ্রাসী রূপের জন্য সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের সারিতে। ব্যাপক দুর্নীতির জন্য দেশবাসীরেক উচ্চমূল্য দিয়ে বিপুল ক্ষতি স্বীকার করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে দুর্নীতির ভয়াবহ ছোবলে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন জর্জরিত। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ সবকিছুকেই কলুষিত করেছে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মামলাবাজি, টোলবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়েছে সন্ত্রাসী চরিত্র, যাকে বলা চলে সন্ত্রাসী দুর্নীতি।

দুর্নীতি উন্নয়নের অন্তরায় : বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। মাথাপিছু বার্ষিক আয় দ্বিগুণ করা, সমৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দারিদ্র্য বিমোচন করার অনেক সুযোগ এখন আমাদের সামনে এসেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি। সর্বগ্রাসী দুর্নীতির ফলে প্রত্যাশিত উন্নয়ন সার্বিকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, লণ্ঠিত হচ্ছে দেশের মূল্যবান সম্পদ, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সেগুলো পাচার করা হচ্ছে বিদেশে। জনগণের দুঃখ ও দারিদ্র্যের অবসান তো দূরের কথা, তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সৃষ্টি হচ্ছে বিপুল ধনবৈষম্য। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দাতাদেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে দুর্নীতিকে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দুর্নীতির মূলোৎপাটন : দুঃখের ও লজ্জার বিষয় হল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নির্দেশিকায় সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় প্রথম সারির নিন্দিত স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এ গ্লানি দূর করার জন্যে সমগ্র জাতির সামনে এখন অন্যতম প্রধান করণীয় হচ্ছে দুর্নীতির মূলোৎপাটন। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক রূপান্তর ছাড়া এই দুর্নীতির ঘুণ থেকে আমাদের রেহাই নেই। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে, দুর্নীতি বিরোধী গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে আগামীতে হয়ত এই সম্ভাবনার পথ খুলে যাবে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয় : আমরা জানি, কালো টাকা, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক গাঁটছড়া দুর্নীতিকে দিয়েছে ভয়াবহ ও অবিশ্বাস্য ব্যাপ্তি। ফলে দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা, কর্ম ও জীবনাচরণ নিয়ন্ত্রণকারী সব কিছুই বর্তমানে দুর্নীতির রাহু কবলিত। রাজনীতি, অর্থনীতি, আহার্য, আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবিকা সবই যদি দুর্নীতির অক্টোপাসের কবলে পড়ে তবে দেশ ও জাতি অনিবার্য পতনের দিকে না যেয়ে পারে না। এ প্রেক্ষাপটেই আমাদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে, অনেক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের যেহেতু দেশের উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক তাই এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি নির্মূল ও সুনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই লাইনচ্যুত দেশকে আবার উন্নয়নের সঠিক রাস্তায় পরিচালিত করতে হবে। যেহেতু বিচার বিভাগের দুর্নীতির বিস্তার রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের পথ খুলে দিয়েছে তাই উন্নয়নের স্বার্থে এ ক্ষেত্রেও সংস্কার অনিবার্য।

দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বেড়াজাল থেকে দেশকে মুক্ত করার জরুরি পদক্ষেপ আজ সময়ের দাবি। এটা কঠিন কাজ। কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিস্বার্থের উর্দ্ধে উঠে দেশপ্রেমিক ত্যাগী অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের মহিমা অর্জন করতে হবে। সব রাজনৈতিক এবং সকল রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে একযোগে নিতে হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। এক্ষেত্রে তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধতা। সেই সাথে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সকল পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

দুর্নীতি বিরোধী সামাজিক আন্দোলন : সম্প্রতি রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা ইত্যাদি পর্যায়ে লাগামহীন দুর্নীতি বিস্তারের ঘটনা ধরা পড়ায় দেশবাসী স্তম্ভিত। বনরক্ষকের দুর্নীতির ঘটনা রূপকথার কাহিনীকেও হার মানিয়েছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে তা প্রতিরোধে আইন ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করা প্রয়োজন। তবে কেবল আইন পরিবর্তন করে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়। কারণ আইন প্রযোগকারী সংস্থার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দুর্নীতির অভিশাপ থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা, জনপ্রতিনিধি, আমলা, পুলিশ, কর্মচারী ও পেশাজীবীদের চিহ্নিত, অপসারিত, ক্ষমতাচ্যুত ও সমাজ-নিন্দিত করতে হবে। দিতে হবে উপযুক্ত শাস্তি। আর সেখানে দেশপ্রেমিক, কল্যাণব্রতী নতুন মানুষকে নিয়োগ দিতে হবে।

উন্নত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে গড়ে তুলতে হবে দেশব্রতী মানবদরদী নতুন সমাজ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা জাগিয়ে নতুন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ জন্যে রাষ্ট্রনেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে দুর্নীতি বিরোধী সামাজিক আন্দোলন। এ আন্দোলনের মূল স্লোগান হতে পারে “দুর্নীতি করে যে দেশের ক্ষতি করে সে”, “দুর্নীতি রোধ কর, উন্নয়নের হাল ধর”।

উপসংহার : দুর্নীতির মূলোৎপাটনে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে। নির্লোভ, সৎ ও দেশব্রতী কর্মীদের যুক্ত করতে হবে এই কাজে। একই সঙ্গে তরুণ সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষকে আজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। গণমাধ্যম, বেসরকারি সেবা সংস্থা ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে কার্যকর অবদান রাখতে পারে এ ধরনের সংগঠনগুলো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মস্তিষ্ক পচন ধরলে শরীরের কোনো অঙ্গ যেমন যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না তেমনি রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে স্বচ্ছন্দ উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজ সক্রিয় ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারে না। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও প্রত্যাশিত উন্নয়নের জন্য তাই সুশাসনের বিকল্প নেই।


💎 উপরের লিখাগুলো ওয়ার্ড ফাইলে সেভ করুন!

মাত্র 10 টাকা Send Money করে অফলাইনে পড়ার জন্য বা প্রিন্ট করার জন্য উপরের লিখাগুলো Microsoft Word ফাইলে ডাউনলোড করুন।

Download (.doc)

Sribas Ch Das

Founder, Developer, Collecter, Writer & Admin

HR & Admin Professional (১২+ বছর) ও কোচিং শিক্ষক (১৪+ বছর)। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহজ Study Content নিশ্চিত করতেই এই ব্লগ।

🏷️ Tag Related

⚡ Trending Posts