ভূগােল ও পরিবেশের উপাদান সমূহের আন্তঃসম্পর্ক :
পরিবেশের উপাদান :
পরিবেশের উপাদান দুই প্রকার। যেমন : জড় উপাদান ও জীব উপাদান। যাদের জীবন আছে, যারা খাবার খায়, যাদের বৃদ্ধি আছে, জন্ম আছে, মৃত্যু আছে তাদের বলে জীব। গাছপালা, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী হলাে জীব। এরা পরিবেশের জীব উপাদান। জীবদের নিয়ে গড়া পরিবেশ হলাে জীব পরিবেশ। মাটি, পানি, বায়ু, পাহাড়, পর্বত, নদী, সাগর, আলাে, উষ্ণতা, আর্দ্রতা হলাে পরিবেশের জড় উপাদান। এই জড় উপাদান নিয়ে গড়া পরিবেশ হলাে জড় পরিবেশ।
পরিবেশের প্রকারভেদ :
পরিবেশ দুই প্রকার। ভৌত বা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সামাজিক পরিবেশ। প্রকৃতির জড় ও জীব উপাদান নিয়ে যে পরিবেশ তাকে ভৌত বা প্রাকৃতিক পরিবেশ বলে। এই পরিবেশে থাকে মাটি, পানি, বায়ু, পাহাড় পর্বত, নদী, সাগর, আলাে, গাছপালা, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, মানুষ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণী। মানুষের তৈরি পরিবেশ হলাে সামাজিক পরিবেশ। মানুষের আচার আচরণ, উৎসব - অনুষ্ঠান, রীতি - নীতি, শিক্ষা, মূল্যবােধ, অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে যে পরিবেশ গড়ে ওঠে তা হলাে সামাজিক পরিবেশ।
ভূ- প্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, নদ - নদী, আয়তন, অবস্থান, খনিজ সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদনসমূহ যেমনিভাবে পরিবেশের উপাদান হিসেবে আমাদের কর্মকান্ডকে প্রভাবিত করে তেমনিভাবে শিক্ষা, সংস্কৃতি, জাতি, ধর্ম, সরকার এগুলাের মত মনুষ্য সৃষ্ট বিভিন্ন উপাদানসমূহও পরিবেশ হিসেবে আমাদের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। তাই পরিবেশের উপাদানসমূহকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা :
ক ) প্রাকৃতিক পরিবেশ;
খ ) অপ্রাকৃতিক বা সামাজিক পরিবেশ।
ক) প্রাকৃতিক পরিবেশ :
প্রাকৃতিক পরিবেশ হচ্ছে সে সব প্রাকৃতিক উপাদানের সমষ্টি যার উৎপত্তি এবং সৃষ্টি সরাসরি সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত বা সৃষ্ট এবং এর উপর মানুষের কোন হাত নেই। নিড় প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রধান প্রধান উপাদানগুলাে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলােচনা করা হলাে :
১. ভূ - প্রকৃতি :
মূলত ভূমির অবস্থা বা ধরনই হচ্ছে ভূ - প্রকৃতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বা অঞ্চলের ভূ - প্রকৃতি মূলত পার্বত্য ভূমি, মালভূমি, সমভূমি, উপত্যকা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের এসব ভূ - প্রকৃতি বিভিন্নভাবে মানুষের অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে থাকে।
২. আয়তন :
আয়তন বলতে কোন দেশের রাজনৈতিক বা আর্জাতিক সীমারেখাকে বুঝায়। একটি দেশের আয়তন ছােট, বড় বা মাঝারি যে কোন ধরনের হতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদান হিসেবে এই আয়তনও মানুষের জীবন যাত্রার উপর ব্যাপকভাবে প্রভাব বিসুর করে থাকে। যেমন- আয়তনে বড় দেশগুলাে সম্পদে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রপূর্ণ হয় যা সেদেশের মানুষের জন্য অনেক বেশী সুবিধাজনক।
৩. অবস্থান :
কোন দেশ পৃথিবীর কোন অঞ্চলে অবস্থিত সেটাই হচ্ছে তার ভৌগােলিক অবস্থান। একটি দেশের ভৌগােলিক অবস্থান চার প্রকারের হতে পারে। যথা :
i) দ্বৈপ অবস্থান; যেমন- জাপান, বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জ ইত্যাদি।
ii) উপদ্বীপ অবস্থান; যেমন - যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ইত্যাদি।
iii) মহাদেশীয় অবস্থান; যেমন- আফগানিস্তান, নেপাল, ভূটান ইত্যাদি।
iv) প্রায় অবস্থান; যেমন- সুইডেন, চীন ইত্যাদি।
কোন দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সুযােগ - সুবিধা এবং এর উন্নতি এই ভৌগােলিক অবস্থানের উপর অনেক নির্ভরশীল।
৪. জলবায়ু :
অবস্থানগত তারতম্যের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উষ্ণ, নাতিশীতােষ্ণ ঠান্ডা, চরম ভাবাপন্ন ইত্যাদি।
অবস্থানগত তারতম্যের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উষ্ণ, নাতিশীতােষ্ণ, ঠান্ডা, চরম ভাবাপন্ন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার জলবায়ু দেখা যায়। জলবায়ুর এই বিভিন্নতার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বাসস্থান শিল্প, ব্যবসায় - বাণিজ্য প্রক্রিয়া, কর্মকুশলতা ইত্যাদির ভেতর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
৫. মৃত্তিকা :
ভূ - পৃষ্ঠের উপরিভাগ যেসব উপাদান দিয়ে গঠিত তাকে মৃত্তিকা বা সহজ কথায় মাটি বলে। মৃত্তিকা মূলত : বেলে, এটেল, দো - আঁশ, পলি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। মৃত্তিকার বিভিন্নতার উপর ভিত্তি করে এদের গঠন প্রকৃতি, উর্বরা শক্তি ইত্যাদিও বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে যার উপর মানুষের উপজীবিকা নির্ভর করে।
৬. স্বাভাবিক উদ্ভিজ্জ :
ভূ - পৃষ্ঠের উপরিভাগে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রকার গাছপালা জন্মে থাকে | এসব গাছপালার সমন্বয়ে বিভিন্ন বনভূমির সৃষ্টি হয় যা পরিবেশের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
৭. খনিজ সম্পদ :
পেট্রোলিয়াম, গ্যাস, কয়লা, লােহা ইত্যাদিকে খনিজ সম্পদ বলে। এগুলাে হচ্ছে পৃথিবীর শিলারে অবস্থিত রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন ধরনের যৌগিক পদার্থ I কোন অঞ্চলে খনিজ সম্পদ ক্ষেত্রের আবিস্কার অতি দ্রুত সেই স্থানের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ধরণ বদলে দিতে পারে।
৮. নদ - নদী ও সাগর :
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, পৃথিবীর আদি সভ্যতাগুলাে নদী অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল। আমরা আরও দেখতে পাই যে, যােগাযােগ ব্যবস্থার সুবিধা থাকার কারণে সাগর বা মহাসাগরের তীরবর্তী দেশগুলাে ব্যবসায়বাণিজ্যে অধিক উন্নতি লাভ করেছে। এক্ষেত্রে আমরা বৃটেন ও জাপানের উদাহরন দিতে পারি। তাই বলা যায় যে, প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে নদ - নদী ও সাগর ব্যবসায় - বাণিজ্যের উন্নতিতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৯. উপকূল রেখা :
উপকূল রেখা প্রাকৃতিক পরিবেশের আরও একটি গুরত্বপূর্ণ উপাদান। এই উপকূল রেখা ভগ্ন বা অভগ্ন উভয় ধরনেরই হতে পারে। ভগ্ন উপকূল রেখা মৎস চাষ, বন্দর ও পােতাশ্রয় নির্মানের জন্য উপযােগী।
১০. প্রাণী ও প্রাণীজ সম্পদ :
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগােলিক পরিবেশ বিরাজ করায় সেখানে বিভিন্ন জীবজন্তুর আবাসস্থল গড়ে উঠেছে। এসব প্রাণীর জাত, উপজাত, বিচরন ক্ষেত্র, আহার ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের। এই প্রাণী ও প্রাণীজ সম্পদের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর অনেক মানুষ তাদের জীবিকা অর্জন করছে।
খ) অপ্রাকৃতিক বা সামাজিক পরিবেশ :
মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব থেকে মেধা ও দক্ষতার বিকাশ, প্রশাসন, ধর্মীয় নীতি, লােকজ সংস্কার ইত্যাদির মাধ্যমে তার নিজের উপযােগী অনুকূল সুযােগ সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। আর পরিবেশের এই অংশটি যা মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তাই হচ্ছে অপ্রাকৃতিক বা সামাজিক পরিবেশ। জাতি, ধর্ম, সরকার, জনসংখ্যা শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি হচ্ছে এই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট সামাজিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান।
১. জাতি :
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন জাতির মানুষ বাস করে। জাতিগত বৈশিষ্ট্য একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই যেসব জাতির লােক পরিশ্রমী, উদ্যমী, বুদ্ধিমান এবং সহিষ্ণু সেসব জাতি তাড়াতাড়ি উন্নতি লাভ করতে পারে।
২. ধর্ম :
বিভিন্ন ধর্মের নিয়ম ও অনুশাসন বিভিন্ন প্রকার। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন মানুষের কর্ম জীবনে যেমনি প্রভাব বিস্তুর করে তেমনি এর প্রভাবের কারণে অর্থনৈতিক কার্যকলাপও ভিন্নরূপে গড়ে ওঠে। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে জীব হত্যা পাপ বলে জৈন ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত অঞ্চল বিশেষ করে চীন, জাপান, মায়ানমার ( বার্মা ) প্রভৃতি দেশে দীর্ঘকাল মৎস ও মাংস শিল্পের প্রসার ঘটেনি।
৩. জনসংখ্যা :
ভূ - প্রকৃতি, উর্বরতা, জীবিকার সংস্থান, যাতায়াত ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ইত্যাদি প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণের উপর ভিত্তি করে জনবসতি গড়ে ওঠে। আর একটি দেশের যাবতীয় অর্থনৈতিক কার্যাবলী এই জনসংখ্যা দ্বারা সম্পাদিত হয়।
৪. সরকার :
সরকার হলাে দেশ পরিচালনায় নিয়ােজিত একটি সংগঠন। কোন দেশের সরকারের কাঠামাে -এর স্থিতিশীলতা ও শক্তিমত্তা, সে দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য একটি দেশে সৎ, বলিষ্ঠ ও জনপ্রিয় সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. শিক্ষা :
সামাজিক পরিবেশের অন্যতম উপাদান হিসেবে শিক্ষা একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। তাই উপযুক্ত ও আধুনিক শিক্ষা উন্নতির সােপান। যে দেশের লােক যত বেশী শিক্ষিত সে দেশ তত উন্নত। উদাহরণ হিসেবে এক্ষেত্রে আমরা জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের নাম বলতে পারি।
৬. সংস্কৃতি :
মানবিক গুণাবলী বিকাশের ক্ষেত্রে সংস্কৃতি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সংস্কৃতিতে অগ্রসর জাতি দ্রুত উন্নতি লাভ করতে পারে।
Comments (0)