eNoteShare.com

প্রবন্ধ রচনা : একটি দিনের দিনলিপি

Article Stats 📡 Page Views
Reading Effort
719 words | 4 mins to read
Total View
19.1K
Last Updated
09-May-2026 | 10:51 AM
Today View
0
প্রতিটি নতুন দিনের পিছনে রয়ে যায় একটি পুরোনো দিন। নতুন দিনের আগমনে পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো হয়ে যায় অতীত। এই অতীতকে আমরা সংরক্ষণ করি আমাদের দিনলিপিতে। একটি দিনের ভালো লাগা মুহূর্তগুলো দিয়ে সাজানো হয় দিনলিপি। নিজ জীবনের প্রতিদিনের ঘটনাবিন্যাস স্থান পায় দিনলিপিতে।

আজ ১৬ ডিসেম্বর। দুপুর বারোটার দিকে দিনটি শুরু হয়েছিল একটু অন্যভাবে। ভোরে উঠেছি বাবার ডাকে, ফুল দিতে যেতে হবে শহীদ মিনারে। বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাই এই দিন বাবাকে নানা কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়। ছোটবেলা থেকে বাবার সাথে আমিও অংশ নেই এ কর্মসূচিগুলোতে। এবার আমি একটু আগেই ফিরে এসেছি বাসায়। বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

বাবা এলো হাস্যোজ্জ্বল মুখে। এই দিনটিতে বাবা খুব উৎফুল্ল থাকেন। বাবার কাছে জানতে চাইলাম, ‘বাবা, প্রতিবছর দেখি এই দিনে তোমার মধ্যে অন্যরকম আনন্দ কাজ করে; কারণ কী, বাবা?’ বাবা বলল, আনন্দে থাকব না! এদিন যে আমাদের গৌরবের দিন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের সকল পরাধীনতা ঘুচে গেছে। এই পরাধীনতার গ্লানি যে কী, তুই বুঝবি না। একই দেশ, তবু সব ক্ষেত্রে বৈষম্য। সব ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছি আমরা। তোর দাদু শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। ব্যাংকে চাকরি করতেন কিন্তু তাকে বিনা কারণে বরখাস্ত করা হলো। এতগুলো ভাই-বোনের এই সংসারে যে কী দুর্যোগ নেমে এলো, তা তোকে বলে বোঝানো যাবে না। বাবার কথা শুনে বলে উঠলাম, সত্যি বাবা? বাবা বলল, এ তো তোকে শুধু ঘরের কথা বললাম, দেশের কথা তো বলাই হলো না।

একটু পর মায়ের ডাকে বাবাকে উঠতে হলো স্নানের জন্য। কিন্তু আমি ঠায় বসে আছি বাবার কাছে বাকি গল্প শোনার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবা ফিরে এলা স্নান সেরে। বলল, জানিস, যেদিন শেখ মুজিব ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দিলেন, সেদিনি ঠিক করেছিলাম যুদ্ধ করব। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েছিল পুরো দেশ। তখন আমরা তরুণ, তোর বয়সী। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে মনে জাগলো কঠিন প্রত্যয়। সিদ্ধান্ত নিলাম, যুদ্ধ হলে আমি যুদ্ধ করব। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। যুদ্ধ শুরু হলে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যোগ দিলাম। খাবার সময় হয়ে গেছে। বাবা বলল, চল খেতে খেতে তোকে বাকি গল্প শোনাই।

বাবা বলছে... সারা দেশে আগুন জ্বলছে। মিলিটারিরা সবকিছু ছারখার করে ফেলছে। এদের সাথে যোগ দিয়েছে রাজাকার-আলবদর বাহিনী। তোর দাদু, ঠাকমা আর পিসিদের নিয়ে ভারতে গেলাম। ভাবিস না খুব আরামে গেছি। মাইলের পর মাইল হেঁটেছি। কিছু দূর গরুর গাড়িতে করে গিয়েছি। তারপর আবার হাঁটতে হয়েছে। তিন দিন পর গিয়ে ভারতে পৌঁছালাম। তোর দাদু ও ঠাকমাদের রেখে প্রশিক্ষণ নিতে গেলাম। প্রশিক্ষণ শেষ করে যখন গ্রামে ফিরছিলাম, তখন পথে দেখি মিলিটারিরা। পাট খেতের মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম একদিন। হঠাৎ দেখি সেই মাঠে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে মিলিটারিরা উপায় না পেয়ে নদীর মধ্যে ডুবে ছিলাম ১০ঘণ্টা। বাবা বলতে বলতে দীর্ঘনিঃশ্বাস নেয়।

হঠাৎ বিকাল তিনটার দিকে বাবার ফোন বেজে উঠল... । বিকেলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে অনুষ্ঠান, সে কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কাকু ফোন দিয়েছেন। ফোন রেখে বাবা বলল, আমি ৭ নম্বর সেক্টরে গিয়ে যোগ দিলাম। প্রথমে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করলাম কিছুদিন। তারপর আগস্ট মাসের শেষ দিকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছি। কত বীভৎস দৃশ্য দেখেছি। চারদিকে লাশ আর লাশ। নদীর জল খেতে গিয়ে দেখলাম লাশ ভেসে যাচ্ছে। আর জল খাওয়া হলো না। একদিন সারা দিন বিভিন্ন মিশন শেষ করে মাঝরাতে যেই খেতে বসেছি, ওমনি দেখি মিলিটারি চলে এসেছে। খাবার রেখেই... । বলতে বলতে বাবার মুখ কালো হয়ে গেছে। বাবা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, কীভাবে যে দিন কেটেছেরে মা। মৃত্যুর মুখ থেকে যে কীভাবে ফিরে এসেছি, তা এক স্রষ্টাই জানেন। এর মধ্যে খবর এলো, তোর ঠাকুমার কলেরা হয়েছে অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু দেশমাতাকে ফেলে নিজ মাতাকে দেখতে যাওয়া হলো না।

বাবার গল্প শেষ হতে হতে বিকাল চারটা বেজে গেল। বাবা উঠে গেলেন। আমি বাবাকে বললাম, বাবা, আমার ভাবতে অনেক কষ্ট হচ্ছে দিনগুলোর কথা। সবাই কত কষ্টে ছিল, জীবন কত অনিশ্চিত ছিল। হ্যাঁরে মা। ওই যে তুই বললি না আমি কেন এত উৎফুল্ল থাকি? আমি আমার কষ্টের মূল্যায়ন পেয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে এখন আমাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এটা যে কত সম্মানের, গর্বের তা বলে বোঝানো যায় না। যদিও স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশের সব স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে একদিন ঠিক হবে দেখবি। এত ত্যাগ বৃথা যাবে না কখনো। বাবা বলল, আজ থাক, যাই অনুষ্ঠানের সময় হয়েছে। বাবা উঠে গেল কিন্তু আমি তখনো ভাবছি সেই দিনগুলোর কথা।

এভাবেই কেটে গেল ১৬ ডিসেম্বরের দিনটি। বাবার গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে আমি অতীতের ইতিহাস জানতে পারলাম। বাবার মুখে শোনা ঘটনাগুলোকেই আমি দিনলিপিতে বন্দি করে রাখলাম।



💎 উপরের লিখাগুলো ওয়ার্ড ফাইলে সেভ করুন!

মাত্র 10 টাকা Send Money করে অফলাইনে পড়ার জন্য বা প্রিন্ট করার জন্য উপরের লিখাগুলো Microsoft Word ফাইলে ডাউনলোড করুন।

Download (.doc)

Sribas Ch Das

Founder, Developer, Collecter, Writer & Admin

HR & Admin Professional (১২+ বছর) ও কোচিং শিক্ষক (১৪+ বছর)। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহজ Study Content নিশ্চিত করতেই এই ব্লগ।

🏷️ Tag Related

⚡ Trending Posts