রচনা : বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন (20 পয়েন্ট)

বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন

ভূমিকা

শেখ মুজিবুর রহমান বঞ্চিত লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর জীবৎকালে দেশে আরও নেতা ছিলেন তাঁরাও খুব জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। বয়সে অভিজ্ঞতায় জ্ঞানের গভীরতায় অনেকেই ছিলেন তাঁর চেয়ে অধিক শিক্ষিত যোগ্য ও দক্ষ। কিন্তু তাঁদের সবাইকে অতিক্রম করে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জীবনে তিনি অর্জন করলেন অভূতপূর্ব সাফল্য। প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসা যেমন তিনি বাঙালিদের দান করেছিলেন বাংলার জনগণও তাঁকে তেমনই ভালোবেসেছিল। নতুন প্রজন্মের তরুণ তরুণীদের কাছে বঙ্গাবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের কাহিনী রূপকথার মত বিস্ময়কর বলে মনে হবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সত্যরূপে তা চিরকাল সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। কবি অন্নদা শংকর রায় এ প্রসঙ্গে লিখেছেন

যতদিন রবে গৌরি যমুনা পদ্মা মেঘনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

 

জন্ম

কোন রাজ পরিবারে অভিজাত জমিদার জোতদার বংশে কিংবা সেকালের অর্থলগ্নিকারক ধনী মহাজনের ঘরে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়নি। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক স্কুল শিক্ষক ছিলেন শেখ লুৎফর রহমান। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ শেখ লুৎফর রহমানের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এক শিশু। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারের আদরের সন্তান হিসেবে মাতা পিতার স্নেহ যত্নে শিশুটি লালিত পালিত ও বর্ধিত হয়। আকিকা অনুষ্ঠান করে মাতা পিতা তাঁর নাম রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান।

 

শিক্ষা

গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। এরপর তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হন। পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা নাটক (বিশেষ করে ঐতিহাসিক নাটক করতে তিনি ভালোবাসতেন। সেই মিশন স্কুল থেকেই তিনি মেট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর চলে যান কলকাতা। সেকালে অখন্ড বাংলার রাজধানী ছিল কলকাতা। ১৯৪৭ সালে শেখ মুজিব কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বিদেশি ইংরেজ জাতি বাংলাকে ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তানকে দুটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিয়ে। চিরকালের জন্য চলে গেলে শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনুষদের ছাত্র হিসেবে পড়াশুনা করেন।

 

রাজনীতি দীক্ষা শুরু

সৎসাহসী বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ শেখ মুজিবের অন্তরে ছিল গভীর দেশপ্রেম। জন্মের পর থেকে তিনি চারপাশের মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করেছেন দুঃখ দুর্দশার চিত্র দারিদ্র্যের হাহাকার শাসকের অন্যায় অত্যাচারের দৃষ্টান্ত। ছাত্রজীবনেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন দেশ ও জাতির মুক্তি এবং জনগণের কল্যাণ সাধন করে একদিন সকলের মুখে হাসি ফোটাবেন। স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি সহজেই হয়ে উঠলেন সকলের মুজিব ভাই। সকলের বন্ধুরূপে দুঃখ ও বিপদের সময় তিনি পাশে এসে দাঁড়াতেন। পাকিস্তান আন্দোলনকালে মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের নেতা হিসেবে তিনি অমূল্য অবদান রেখেছেন। পিতার প্রেরণা এবং মায়ের দোয়া আশীর্বাদ নিয়ে তিনি দেশ ও দশের কল্যাণে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতেন। তিনি দেখেছিলেন বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল। ইসলামকে। প্রাণের শুনেছিলেন বিদ্রোহ ও বিপ্লবের বাণী। তিনি সংস্পর্শে এসেছিলেন বাংলার গৌরব নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক গণতন্ত্রের মানস পুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বাংলার নয়নমণি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর। সবার কাছ থেকে তিনি মৌমাছির মত মধুময় সৎগুণ মহত্ত্ব চরিত্র শক্তি আহরণ করেছেন। তিনি নিজে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে নানা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সকলকে অতিক্রম করে হয়ে উঠেলেন বাংলার মুক্তিদূত বঙ্গবন্ধু।

 

সঙ্গায়ী জীবন ও নেতৃত্বে

শেখ মুজিবুর রহমান যোগদান করেছিলেন তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগে। সভাপতি মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। দেশ ও দশের জন্য ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায় করতে গিয়ে তিনি কারানির্যাতন ভোগ করেছেন। তাঁর উপর নেমে এসেছে প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রের কালোমেঘ। তরুণ বয়সে তিনি একবার মন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু দলকে শক্তিশালী ও গণভিত্তিক করার জন্য তিনি সে মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি ও স্বায়ত্বশাসনের জন্য ঘোষণা করেছিলেন ৬ দফা কর্মসূচি। পাকিস্তানের সামরিক সরকার বাঙালির গণতান্ত্রিক লড়াই এবং মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলনকে জেল জুলুম ব্যায়নট বুলেট দিয়ে স্তব্ধ করে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু শাসক ও শোষক চক্রের বন্ধন যতই শক্ত হয়েছে বাংলার মুক্তিকামী মানুষের প্রাণের আবেগ ততই বেড়ে ওঠে।

 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

পাকিস্তানের শাসকচক্র বাঙালির গণতান্ত্রিক চেতনাকে নস্যাৎ ও ৬ দফা আন্দোলন স্তষ্ক করতে বাঙালির প্রাণপ্রিয় সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিবর রহমানকে মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় আসামী বানিয়ে ফাঁসিতে ঝুলানোর চক্রান্ত করে। কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে নেতা শেখ মুজিবকে জেলখানার মৃত্যুকক্ষে আটক রেখে তার মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। বন্দী অবস্থায় অন্যতম আসামী ও কারাবন্দী সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা করে পশ্চিমা পুলিশ। সেদিন শেখ মুজিবকেও গুলি করে মারতে চেয়েছিল। কথায় বলে রাখে আল্লাহ মারে কে?১৯৬৮ সালে পূর্ব বাংলা ও পাকিস্তানের সব জায়গায় গণতন্ত্রের সংগ্রাম অত্যন্ত জোরালো হলো। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব বাংলায় ঘটল গণ অভ্যুত্থান। এতে ষড়যন্ত্র মামলার আয়োজক চক্রান্তকারীরা শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কারামুক্ত নেতৃবৃন্দ সংগ্রামী জনতার মাঝে আবার ফিরে এলেন। আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে চারদিকে জয়ধ্বনি উঠলো জয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। ফাঁসির আসামী থেকে জনগণের প্রাণের নেতা শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু। এ জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমরণ ছিলেন বাংলা ও বাঙালির কাছে কৃতজ্ঞ। অভিজ্ঞতায় সবাইকে অতিক্রম করে বাঙালির প্রাণপ্রিয়। প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসা যেমন জন্মের তরুণ-তরুণীদের কাছে বঙ্গবন্ধুর তারূপে তা চিরকাল সোনার অক্ষরে লেখা।

 

৭০- এর নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা

১৯৭০ সালের খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা ঘটে। একটি নভেম্বরে প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় অপরটি সারাদেশে সাধারণ নির্বাচন। পাকিস্তানে তখন সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের হাতে সমস্ত ক্ষমতা। ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে তিনি জেনারেল আইয়ুব খানের কাছ থেকে শাসন ক্ষমতা নিয়েছিলেন। ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের উপকূলে পাঁচ লক্ষ মানুষ মারা যায়। লক্ষ লক্ষ ঘর বাড়ি হয় ধ্বংস। কিন্তু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তা দেখতে এলেন না। কোটি কোটি টাকার বিদেশি রিলিফ দ্রব্য করাচি বিমান বন্দরে জমা হতে থাকল দুর্গত পূর্ব বাংলায় তা বিতরণের ব্যবস্থা হলো না। দ্বিতীয় ঘটনা হলো সাধারণ নির্বাচন। পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়যুক্ত হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। পশ্চিম পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ কোন আসন লাভ করতে পারল না। তদ্রূপ পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব বাংলা থেকে কোন আসন তারা পেল না। এতে দেখা গেল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়যুক্ত আওয়ামী লীগই সরকার গঠনের দাবিদার। কিন্তু সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন না। পুলিশ ও মিলিটারি দিয়ে শাসন চালাবার জন্য একের পর এক চক্রান্ত করতে লাগল এবং শেষে যুদ্ধ চাপিয়ে দিল। ভারক ধনী মহাজনের ঘরে শেখ মুজিবুর র রহমান। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ শেখ বারের আদরের সন্তান হিসেবে মাতা নাম রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান।স্কুলে ভর্তি হন। পড়াশুনার পাশাপাশি ন স্কুল থেকেই তিনি মেট্রিকুলেশন পাস সালে শেখ মুজিব কলকাতা ইসলামিয়া কিস্তানকে দুটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনুষদের ছাত্র প্রম। জন্মের পর থেকে তিনি চারপাশের ত্যাচারের দৃষ্টান্ত। ছাত্রজীবনেই তিনি হাসি ফোটাবেন। স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি পাশে এসে দাঁড়াতেন।

 

স্বাধীনতা ঘোষণা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সমস্ত কিছু পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন আলোচনা করলেন উপায় বলে দিলেন কিন্তু জবাব এলো বুলেট ও বেয়োনেটে। ২৫ মার্চের কাপো রাতে হানাদার পাকিস্তান বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো। ২৭ মার্চ মেজর জিয়া চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

 

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দেশপ্রেমিক দল ও দেশের আপামর জনগণের সহযোগিতায় গড়ে তুলে মুক্তিবাহিনী গঠন করে মুক্তিবনগর সরকার। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহিদের ও দূ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হলো। পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টরূপে দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন।

 

রাজনৈতিক জীবন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময়। স্কুলের ছাদ সংস্কারের জন্য একটি দল গঠন করে নিজ নেতৃত্বে তিনি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নিকট দাবি পেশ করেন। ১৯৪০ তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে এক বছরের জন্যে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯৪২ সালে এনট্র্যান্স পাশ কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে আইন পড়ার জন্য ভর্তি হন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ) পড়া থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দান করার সুবাধে তিনি বাঙালি মুসলিম নেতা হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন। একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে তোলার আন্দোলন নিয়ে তিনি ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান পৃথক হওয়ার পর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়। মুসলিমদের রক্ষা করার জন্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত হন। এরপর ঢাকায় ফিরে এসে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারির ৪ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রধান ছাত্রনেতায় পরিণত হন।

 

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

মূলত বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক তৎপরতার বিকাশ ঘটে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন গণ পরিষদের ১৯৪৮ সনের ফেব্রুয়ারি ২৩ তারিখে অধিবেশনে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলার পরিপেক্ষিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

তখন বঙ্গবন্ধু এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরুর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৮ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে এর সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। এ বছর ১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালনের সময় তিনি গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন।বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে সুপারিশ করে পূর্ববঙ্গ পরিষদে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে এ মর্মে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের নাজিমুদ্দিন সরকার চুক্তিবদ্ধ হলে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

 

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন

১৯৫৩ সালে দলের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ১৪ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অন্যান্য দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৩৭ টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩ টি আসনে বিপুল ব্যবধানে জয় লাভ করে। যার মধ্যে ১৪৩ টি আসনই আওয়ামী লীগ লাভ করেছিল। গোপালগঞ্জে আসনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল শক্তিশালী মুসলিম লীগ নেতা ওয়াহিদুজ্জামান। যাকে তিনি ১৩০০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ১৫ মে বঙ্গবন্ধু কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর ২৯ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয় এবং ৩০ মে ঢাকায় ফিরার পথে বন্দর থেকেই তাকে আটক করা হয়। দীর্ঘ ৭ মাস পর ২৩ ডিসেম্বর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালের ৫ জুন আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হলে তিনি পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ২১ দফা দাবি পেশ করেন।

 

ছয় দফা আন্দোলন

১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। এ সময় বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধকল্পে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এ দেশের মানুষের অধিকার আদায় এবং শােষণ বঞ্চনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বহুবার গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন। ১৯৬৬ সালে তিনি পেশ করেন বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক মুক্তির সনদ ছয় দফা। এ সময় নিরাপত্তা আইনে তিনি বারবার গ্রেফতার হতে থাকেন। আজ গ্রেফতার হয়ে আগামীকাল জামিনে মুক্ত হলে সন্ধ্যায় তিনি আবার গ্রেফতার হন। এরকমই চলে পর্যায়ক্রমিক গ্রেফতার। তিনি কারারুদ্ধ জীবনযাপন করতে থাকেন। তাঁকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা হয় আগরতলা মামলা।

 

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও বঙ্গবন্ধু

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালীন সময়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি ৫ তারিখে দফা দাবি পেশ করে যার মধ্যে শেখ মুজিবের ছয় দফার সবগুলোই দফাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়। যা পরবর্তীতে গণ আন্দোলনের রূপ নেয়। এই গণ আন্দোলনই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নাম পরিচিত। মাসব্যাপী চলতে থাকে আন্দোলন কারফিউ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ পুলিশের গুলিবর্ষণ। পরবর্তীতে এই আন্দোল চরম রূপ ধারণ করলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান তাদের রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে গোলটেবিলে বৈঠকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

উপাধি

১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আয়ােজিত রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ মানুষের এক নাগরিক সংবর্ধনায় তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের জাতির জনক বা জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি ২০১৯ সালের ১৬ আগস্ট জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে তাকে বিশ্ব বন্ধু (ফ্রেন্ড অব দ্যা ওয়ার্ল্ড) হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২০২০ সালের গান্ধী শান্তি পুরষ্কারের জন্য বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষণা করে। বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে এই পুরষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়।

 

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড

দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়। বিজয় দিবস বাঙালির বিজয় সূচিত হয়।বাংলাদেশের বিজয়ের পর ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেওয়া হয়। দেশে ফেরার পর ১২ই জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শাসনভার গ্রহন করেন। এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তােলার কাজে আত্মনিয়ােগ করেন। কিন্তু পরাজিত হায়েনার দল তার সাফল্য ও বাঙালির উত্থানকে মেনে নিতে পারেনি। তাই আবার শুরু হয় ষড়যন্ত্র। দেশ যখন সকল বাধা দূর করে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন দেশীয় ষড়যন্ত্রকারী ও আন্তর্জাতিক চক্রের শিকারে পরিণত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সামরিক বাহিনীর তৎকালীন কিছু উচ্চাভিলাষী ও বিপথগামী সৈনিকের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। তাই বাঙালি জাতি প্রতিবছর ১৫ ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করে।

 

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গ্রন্থাবলি

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই দুইটি খন্ডে তার আত্মকাহিনী লিখেন। যেখানে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করেছেন। মৃত্যুর পর তার কন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রচনা দুটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করেন। শারীরিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু হলেও তিনি অমর অক্ষয়। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর বৈচিত্র্যময় জীবনের অসাধারণ এক খণ্ডাংশ অসমাপ্ত আত্মজীবনী। দেশপ্রেমিক প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে চির অম্লান হয়ে রয়েছে একটি নাম- শেখ মুজিবুর রহমান। কবি অন্নদাশংকরের ভাষায় বলতে হয়-

যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘন বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তােমার শেখ মুজিবুর রহমান।

 

বঙ্গবন্ধুর অবদান

দ্বিধাবিভক্ত পরাধীন জাতিকে সুসংগঠিত করে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করা এবং সঠিক নেতৃত্ব দেওয়া সহজ কাজ নয়। অথচ এই কঠিন কাজটি বঙ্গবন্ধু খুব সহজেই করতে পেরেছিলেন। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম সবই পরিচালনা করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান অসীম দক্ষতা ও যােগ্যতায়। তাঁর ছিল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার মতাে অসাধারণ বজ্রকণ্ঠ। অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে তাঁর ছিল বিপুল খ্যাতি। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে। অকৃত্রিম দেশপ্রেম সাধারণ জনগণের প্রতি গভীর ভালােবাসা অমায়িক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত বুদ্ধি তাঁকে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছে। স্বাধীনতার পর তিনি খুব বেশিদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পাননি। যতটুকু সময় ক্ষমতায় ছিলেন তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি ক্ষমতা লাভের পর কিছুদিনের মধ্যে ভারতীয় বাহিনীর দেশত্যাগ করা এবং মুক্তিবাহিনীর অস্ত্রসমর্পণ করার ঘােষণা দেন। বিশ্বের ১০৪টি দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও ইসলামি সম্মেলন সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে বঙ্গবন্ধুর আমলে। ১৯৭২ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। তাঁর সরকারের সময় ব্যাংক বিমাসহ শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৭৪ সালে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলায় বক্তৃতা দেন। তাঁর নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছিল বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা বাঙালি জাতির জীবনে সূচনা করেছে এক নবদিগন্ত। আত্মপরিচয়হীন জাতি খুঁজে পেয়েছে তার অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা।

 

মুজিব বর্ষ

মুজিব বর্ষ হলো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিক পালনের জন্য ঘোষিত বর্ষ। বাংলাদেশ সরকার ২০২০-২১ সালকে (১৭ই মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ই মার্চ ২০২১ পর্যন্ত) মুজিব বর্ষ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। এবং অনেক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। করোনাভাইরাসের কারণে কর্মসূচিগুলো নির্ধারিত সময়ে যথাযথভাবে করতে না পারায় মুজিববর্ষের মেয়াদ প্রায় ৯ মাস বাড়িয়ে সময়কাল ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। ২০১৯ সালের ১২-২৭ নভেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ৪০তম সাধারণ অধিবেশনে অধিবেশনে ২৫ নভেম্বরে ইউনেস্কোর সকল সদস্যের উপস্থিতিতে মুজিব বর্ষ পালনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মুজিব বর্ষ পালনে তুমি বাংলার ধ্রুব তারা শিরনামে একটি থিম সঙ্গিত রচনা করা হয়। গানটি লিখেছেন কামাল চৌধুরী এবং গানে কণ্ঠ দিয়েছে দেশের বরেণ্য সব শিল্পীরা।

উপসংহার

শেখ মুজিবের জীবন কাহিনী বাংলাদেশের রক্তে রাঙ্গা ইতিহাস। বাংলাদেশ ও শেখ মুজিবুর এক সত্তা এক চেনা এক বিবরণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য শেখ মুজিবকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। তিনি স্বশরীরে আজ আর আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম জনগণের মুক্তির জন্য মহান আত্মত্যাগ ও গণতন্ত্রের আদর্শ মান হয়ে আছে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্য তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে থাকবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *