রচনা : অধ্যবসায় (১৮ পয়েন্ট)

অধ্যবসায়

সূচনা

সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়। কোন লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ যত্ন সহকারে কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে বারংবার চেষ্টা করার নামই অধ্যবসায়। মানব জীবনে ব্যর্থতা আসা নিতান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু এ ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে না পড়ে বারবার চেষ্টা চালিয়ে গেলে স্বর্ণ সাফল্যের মনিদ্বীপে পৌছানো সম্ভব। পৃথিবীর নানা দেশ জাতি এবং ব্যক্তির জীবনে এর যথার্থ প্রমাণ পাওয়া যায়। সংগ্রামই জীবনের মর্মবাণী। অন্তহীন সংগ্রামের ইতিহাসই জীবনের ইতিহাস। জীবনের বিকাশের মূলে রয়েছে যে অভিব্যক্তিবাদ বা বিবর্তনবাদ তা সেই সংগ্রামেরই কাহিনী। বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে আজ অন্যতম মানবিক গুণ হচ্ছে অধ্যবসায়। অধ্যবসায়ের বলেই মানুষ পৃথিবী থেকে অসম্ভব কথাটি বিতাড়িত করেছে।

 

অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা

অধ্যবসায় মানব জীবন সংগ্রামের মৌল প্রেরণা। সংগ্রামে জয় আছে আছে পরাজয়। কিন্তু পরাজয়ই শেষ কথা নয়। পরাজয় হচ্ছে নতুনতর জয়েরই পথিকৃৎ। অতএব ধৈর্য ধরো ধৈর্য ধরো বাঁধো বাঁধো বুক। বারবার চেষ্টার ফলেই মানুষের ভাগ্যাকাশে উদিত হয় সাফল্যের ধ্রুবতারা। অধ্যবসায়ের গুণেই মানুষ বড় হয় অসাধ্য সাধন করতে পারে। জগতে বড় বড় শিল্পী সাহিত্যিক বৈজ্ঞানিক সেনানায়ক ধর্মপ্রবর্তক সবাই ছিলেন অধ্যবসায়ী। তাই মানব জীবনের প্রতিটি স্তরে অধ্যবসায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ছাত্রজীবনেও সফলতা অর্জনে অধ্যবসায়ের মূল্য অপরিসীম। গভীর আত্মপ্রত্যয় সহকারে অবিরাম অনুশীলন করলে দুরূহ বিষয়ও আয়ত্তে এসে যায়। এ রকম প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবিচল অধ্যবসায় মানুষকে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে পৌছে দেয়।

 

ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়

ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়ের প্রয়োজন সর্বাধিক। ছাত্ররা সমাজের ভাবী গৌরব কেতন। বিশ্বের কোটি কোটি বঞ্চিত ভাগ্যহত মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অধ্যবসায়ী ছাত্র স্বল্প মেধাশক্তিসম্পন্ন হলেও সাফল্য লাভ করতে পারে। কাজেই অকৃতকার্য ছাত্র- ছাত্রীকে হতাশ না হয়ে পুনরায় দ্বিগুণ উৎসাহে অধ্যয়নে মনোনিবেশ করা উচিত। কারণ অধ্যবসায়ই পারে ব্যর্থতার গ্লানি মুছে দিয়ে সাফল্যের পথ দেখাতে।

 

অধ্যবসায় ও প্রতিভা

অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী না হলে বড় কাজ সাধন করা যায় না এমন ধারণা পোষণ করা মোটেও উচিত নয়। কারণ অধ্যবসায় ও পরিশ্রম ব্যতিত শুধু প্রতিভায় কাজ হয় না। জগতে বহু বিখ্যাত লোক জন্মেছে যারা প্রতিভাবান অপেক্ষা অধ্যবসায়ীই ছিলেন বেশি। ভলটেয়ার বলেছেন প্রতিভা বলে কিছু নেই। পরিশ্রম ও সাধনা করে যাও। তাহলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে।

 

জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়

জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোনো জাতি যদি অধ্যবসায়ী হয় তবে সে জাতি অবশ্যই মর্যাদার আসনে আরোহন করতে পারবে। যেমন: জাপান একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হয়েও পৃথিবীর একটি উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত যা সম্ভব হয়েছে অধ্যবসায়ের দ্বারা। যে জাতি যত বেশি অধ্যবসায়ী সে জাতি ততো বেশি উন্নত। জাতি সগৌরবে আরোহন করতে হলে সকল নাগরিককে সামগ্রিকভাবে অধ্যবসায়ী হতে হবে। সকলের একনিষ্ঠ সাধনার দ্বারা উন্নত জাতিতে পরিণত হতে পারবে এবং বিশ্বের রোল মডেলে পরিণত হতে পারবে। পৃথিবীর কোনো সভ্যতাই একদিনে কিংবা একক কোনো প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠেনি। বারবার চেষ্টা এবং সাধনা দিয়ে সম্ভাবনার ভিত্তি করতে হয়। সৃষ্টির প্রথম মানবগোষ্ঠীর সভ্যতাও স্তরে স্তরে গড়ে উঠেছে। কোনো একটি জাতি তখনই পৃথিবীর বুকে মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে সগৌরবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে যখন জাতীয় উন্নয়নে দল মত নির্বিশেষে সবাই সর্বশক্তি দিয়ে নিজেদের আত্মনিয়োগ করবে। তাই জীবনে অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অধ্যবসায়ের ভূমিকা

পৃথিবীর প্রতিটি বৈজ্ঞানিকের আবিষ্কারের পশ্চাতে রয়েছে অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল ভূমিকা। মানুষ বিদ্যুৎ আবিষ্কার করে দূর করেছে আঁধার বিমান আবিষ্কার করে জয় করেছে আকাশ রকেটের সাহায্যে অর্জন করেছে চন্দ্রবিজয়ের গৌরব। আর এসব সাফল্যের পেছনে কাজ করছে মানুষের যুগ যুগান্তরের সাধনা তাঁদের অবিরাম অধ্যবসায়।

 

মনীষীদের জীবনে অধ্যবসায়

জগতে যারা মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার আদর্শ হয়েছেন ব্যক্তিজীবনে তারা সবাই অধ্যবসায়ী ছিলেন। মহাকবি ফেরদৌসীর অমর মহাকাব্য শাহনামা তার সুদীর্ঘ তিরিশ বছরের সাধনার প্রয়াস।জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস বিশ বছরের একক প্রচেষ্টায় রচনা করেন বাংলা সাহিত্যে পঞ্চাশ হাজারের বেশি শব্দ সংবলিত বাংলা ভাষার অভিধান। আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নিজের চেষ্টা ও সাধনার জন্য দরিদ্রতার সাথে লড়াই করে সংগ্রহ করেছিলেন দু’হাজার প্রাচীন পুঁথি। যার জন্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রায় চারশ বছরের ইতিহাস জানা যায়। মনীষী কার্লাইল অনেক বছরের শ্রমে ফরাসি বিপ্লবের অসামান্য ইতিহাস লিখেছিলেন। মহাবিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন নিজেই স্বীকার করেছেন বিজ্ঞানে তার অবদানের মূলে রয়েছে তার সাধনা। সেজন্য বলা যায় সাধারন মানুষ অপেক্ষা মনীষীদের জীবন অত্যধিক ত্যাগ পরিশ্রম সাধনা এবং অধ্যবসায়ের। সেজন্যই সাধারন মানুষদের ভেতর থেকে তারা হয়েছিলেন অসাধারণ। যার মূলে রয়েছে তাদের অধ্যবসায়ের মূলমন্ত্র।

 

অধ্যবসায়ের দৃষ্টান্ত

পৃথিবীতে যে কোন কর্মবীরের জীবন চরিত আলোচনা করলে দেখা যায় যে তাঁদের কর্মব্রতে অধ্যবসায়ই ছিল মূল চালিকাশক্তি। অধ্যবসায়ী ছিলেন বলেই সম্রাট নেপোলিয়ান এমন দৃঢ়কণ্ঠে বলতে পেরেছিলেন অসম্ভব শব্দটি কেবল নির্বোধের অভিধানেই পাওয়া যায়। স্কটল্যান্ডের রাজা বরার্ট ব্রুস অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ইংরেজদের সঙ্গে পরপর ছয়বার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি ভগ্ন হৃদয়ে বনে পালিয়ে যান। একদিন এক পরিত্যাক্ত দুর্গে তিনি চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। এমন সময় তিনি দেখতে পেলেন একটি মাকড়সা বারবার একটি স্তম্ভের গায়ে উঠার চেষ্টা করছে কিন্তু খানিকটা উঠেই পড়ে যাচ্ছে। ছয়বার চেষ্টার পর সপ্তমবারে সে স্তয়গাত্রে উঠতে সমর্থ হলো। সামান্য একটি প্রাণীর এরূপ আদম্য প্রচেষ্টা এবং সাফল্যলাভের দৃশ্য রবার্ট ব্রুসকে অশেষ প্রেরণা যুগিয়েছিল। তিনি পুনরায় সৈন্য সংগ্রহ করে শত্রুর হাত থেকে স্বদেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছিলেন।

 

মানব সভ্যতায় অধ্যবসায়

আজকের সভ্য জগৎ আমাদের পূর্ব পুরুষদের অধ্যবসায়ের ফল। এ পৃথিবী একদিন ছিল মানুষের বসবাসের অনুপযোগী। মানুষ ছিল বনচর জন্তুর মতো। তখন তাদের ভাষা পরিবার সমাজ রাষ্ট্র নির্মাণকৌশল ইত্যাদি কোনো কিছুই ছিল না। গুহাবাসী মানব অনন্ত সাধনা ও অধ্যবসায়ের গুণে আজ সভ্যতার চরম শিখরে আহরণ করেছে। যুগ যুগ ধরে মনীষীদের সাধনালব্ধ জ্ঞানের সমন্বয়ে আজ প্রকৃতি এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। যাত্রা করেছে মানুষ গ্রহ হতে গ্রহান্তরে। প্রাচীন বিবস্ত্র মানুষ বস্ত্রের আলোকে বানিয়ে নিয়েছে সভ্য জগত। যাযাবর ছেড়ে মানুষ আজ উন্নত জীবনের সর্বোচ্চ বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। এসবের সবই সম্ভব হয়ে অধ্যবসায় নামক শব্দের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সাধনায়।

 

অধ্যবসায় জীবনের চিরায়ত সংগ্রামী শক্তি

কোনো কাজে অধ্যবসায়ী হওয়া মানে জীবন দিয়ে সংগ্রাম করা। জীবনের প্রতিটি কর্মে অধ্যবসায় ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জনের পথরেখা আমাদের সামনে হাজির হবে।

 

অধ্যবসায়হীন মানুষের অবস্থা

অধ্যবসায়হীন ব্যক্তি জীবনে কখনও কোন কাজে সফলতা লাভ করতে পারে না। চলার পথে কোন সমস্যা বা বাধা বিপত্তি দেখা দিলে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে কপালে হাত দিয়ে বসে থাকে এবং ভাগ্যকে দোষারোপ করে। এরা আলোকিত পরিবেশেও অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনযাপন করে। সুখ সমৃদ্ধির পরিবর্তে এরা দুঃখের কাল সমুদ্রে নিপতিত হয়।

 

অধ্যবসায়ই উন্নতির মূলমন্ত্র

সৃষ্টির আদি লগ্নে মানুষ ছিল অসহায়। পদে পদে তারা বিপদগ্রস্ত ছিল। কিন্তু এসব বাধা বিপত্তি ও বিপদকে তারা ভয় না পেয়ে হতোদ্যম না হয়ে বরং অবিচল ধৈর্য একনিষ্ঠ চেষ্টা ও অপরিসীম শ্রমের মাধ্যমে এসব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটিয়েছে। অর্থাৎ জীবনে চলার পথে বাধা আসবেই। সুতরাং এতে ভয় না পেয়ে তা উতরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। জীবনে অসাধ্য বলে কিচ্ছু নেই। ধৈর্য ও সাহস নিয়ে মানুষকে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতময় পথ অতিক্রম করতে হয়। দুঃখ দৈন্যের সাথে লড়াই না করে এবং বিপদকে মোকাবিলা না করে জীবনে সাফল্য অর্জিত হয় না। এজন্যই বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন –

মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়
আড়ালে তার সর্য হাসে।

 

ব্যক্তিজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব

ব্যক্তিজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব অত্যধিক। সব মানুষের শক্তি সমান নয়। কিন্তু সবাইকে উন্নত জীবনের সন্ধানে যেতে হয়। সেখানে যদি অধ্যবসায়ের যথার্থ প্রয়োগ করা যায় তবে শক্তির স্বল্পতা সাফল্যের পথে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষই প্রতিভা নিয়ে জন্মলাভ করে।এক্ষেত্রে কারো প্রতিভা থাকে জাগ্রত কাহারো বা সুপ্ত। এই সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করতে প্রয়োজন সাধনা এবং কঠোর পরিশ্রমের। তাই শুধু প্রতিভা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। কেননা একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি জীবনযুদ্ধে পরাজীত হতে পারেন যদি না তিনি অধ্যবসায়ী হন। অধ্যবসায় মানব চরিত্রের এক উৎকৃষ্ট গুণ। মানবসভ্যতার সেই অস্ফুট মুহূর্ত হতে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল আজও তার শেষ হয়নি। এ সংগ্রামই মানুষের অভিজ্ঞানপত্র। জীবন যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে দরকার সাহস ও অধ্যবসায়ের। এ শক্তি মানুষের এক মহান চারিত্রিক লক্ষণ। দুর্বলচিত্র মানুষ কখনো অধ্যবসায়ী হতে পারে না। কারণে-অকারণে সামান্য প্রতিকূলে তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। অধ্যবসায় ব্যক্তিজীবনে সফলতা এনে দেয়। ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য প্রয়োজন কাজের আগ্রহ বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এবং সুদূর সংকল্প। জীবনে কোনো কিছুই সহজলভ্য নয়। অধ্যবসায় ব্যক্তিজীবনের সকল আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে দেয়। তাই ব্যক্তিজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

অধ্যবসায়ের উদাহরণ

জগতে যত বড় শিল্পী সাহিত্যিক বৈজ্ঞানিক সেনানায়ক ধর্মপ্রবর্তক রয়েছেন তাঁদের সবাই ছিলেন অধ্যবসায়ী। ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে তার দৃষ্টান্ত।মহাকবি ফেরদৌসি দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে রচনা করেছিলেন অমর মহাকাব্য শাহনামা। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দশ বিশ বছরের একক প্রচেষ্টায় রচনা করেন পঞ্চাশ হাজারের বেশি শব্দ সংবলিত বাঙলা ভাষার অভিধান। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নিজের চেষ্টা ও সাধনায় দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে সংগ্রহ করেছিলেন দুহাজার প্রাচীন পুঁথি যার ফলে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রায় চারশ বছরের ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উদ্ঘাটিত হয়।১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে বেরোয় জনসনের বিখ্যাত অভিধান এ ডিকশনারি অফ দি ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ যাকে ইংরেজ জাতি গ্রহণ করে এক মহৎ কীর্তিরূপে ফরাসিরা যা সম্পন্ন করেছে একাডেমির সাহায্যে ইংরেজ তা করেছে এক ব্যক্তির শ্রমে মেধায় এতৃপ্তি পাওয়ার সাথে সাথে ভাষার মানরূপ শনাক্তির জন্যে একাডেমি প্রতিষ্ঠার সমস্ত স্বপ্ন ত্যাগ করে ইংরেজ। মনীষী কার্লাইল অনেক বছরের শ্রমে ফরাসি বিপ্লবের এক অসামান্য ইতিহাস লিখেছিলেন। এসবই অধ্যবসায়ের ফসল।

 

অধ্যবসায়ের প্রাচীন ও বর্তমান রূপ

মানব সভ্যতার মূলে রয়েছে অধ্যবসায়ের এক বিরাট মহিমা। প্রকৃতির কোলে যে মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল অপরিচিত প্রতিকূল পরিবেশে নিতান্ত অসহায়ভাবে সেই মানুষই মাটিতে পানিতে আকাশে বিরুদ্ধ শক্তিকে মোকাবেলা করে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে। নিজের চেষ্টাতেই অনাবাদী মাটি আবাদ করে ফলিয়েছে ফসল, আগুনের ব্যবহার শিখে তাকে নিজের ভৃত্যে পরিণত করেছে। প্রকৃতিকে জয় করতে গিয়ে সাগর ভরাট করে নগর গড়েছে মরুভূমিকে করেছে মরূদ্যান। এভাবে আদিমগুহাচারী মানুষ আজ মহাশনো পাড়ি জমিয়েছে।

 

ইতিহাসে অধ্যবসায়ীরা

জগতে যাঁরা মানবজাতির জন্যে মহৎ অবদান রেখে মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা কুড়িয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন অধ্যবসায়ী। ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে তার দৃষ্টান্ত। কী অসাধ্যই না সাধন করেছেন তাঁরা। মহাকবি ফিরদৌসি দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে রচনা করেছেন অমর মহাকব্য শাহনামা। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দশ বিশ বছরের একক প্রচেষ্টায় রচনা করেন পঞ্চাশ হাজারের বেশি শব্দ সংবলিত বাংলা ভাষার অভিধান।

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই পুরোপুরি নিজের চেষ্টায় ও সাধনায় দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে প্রায় দু’হাজার প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করেন খ্যাতনামা সংগ্রাহক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। এর ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রায় চারশ বছরের ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উদ্ঘাটিত হয়। কবি ভার্জিল ইনিড মহাকাব্য রচনা করেন এগারো বছর ধরে।ইংরেজ প্রাবন্ধিক ঐতিহাসিক ও দার্শনিক টমাস কার্লাইল ৩৯ বছর বয়সে একনিষ্ঠ শ্রমে রচনা করেছিলেন ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস। গ্রন্থের প্রথম খণ্ডটি লেখা শেষ হলে প্রকাশকের নির্দেশে সেটি তিনি পড়তে দেন জন স্টুয়ার্ট মিলকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য কার্লাইলের। মিলের এক পরিচারিকার কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় প্রথম খণ্ডের সমগ্র পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়ে যায়। কিন্তু তাতে দমে যান নি অধ্যবসায়ী কার্লাইল।আবার নতুন করে তৈরি করেন পুরো পাণ্ডুলিপি। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস পরপর ছয়বার ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়েও হাল ছাড়েন নি। শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হয়েছিলেন। নিউটন নিজেই স্বীকার করেছেন বিজ্ঞানে তাঁর অবনদানের মূলে আছে বহু বছরের একনিষ্ঠ ও নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম। কথিত আছে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলতেন তাঁর অভিধানে অসম্ভব শব্দটির স্থান নেই।

তাই জীবনে সফলতার জন্যে অধ্যবসায় নিঃসন্দেহে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আর অধ্যবসায়ী হতে হলে অসহিষ্ণু হলে চলবে না। অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতাকে অর্জন করা যেমন সম্ভব তেমনি যোগ্যতার বলে অনেক প্রতিকুলতা কাটিয়ে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে যাওয়াও বিচিত্র নয়। এক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে জরুরি তা হলো নিজের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা। চারিত্রিক দৃঢ়তা অধ্যবসায়ী ব্যক্তিকে যে কোনো কাজে অকে বেশি আগ্রহী করে তোলে। এতে মানবীয় সৎ গুণাবলি বিকাশের পথ প্রশস্ত হয়।

 

অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস

জগতে বড় হতে প্রতিভাবান হতে হবে এটা নিছক অমূলক একটি কথা। আত্মবিশ্বাসের সাথে সকল বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে পরিশ্রমী ব্যক্তিই জগতে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। উন্নত বিশ্বের প্রতিটি বড় বড় সাফল্যের পেছনে কাজ করে তাদের আত্মবিশ্বাস।

শৈশবে আইনস্টাইনকে দেখে তার শিক্ষকরা বলে দিয়েছিলেন তাকে দিয়ে কিছু হবে না। অথচ পরবর্তী জীবনে তিনি তার অসাধারন মেধা আর আত্মবিশ্বাসে জোরে কোয়ান্টাম তত্ত্বের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্ব দিয়ে পৃথিবী বুকে অমর হয়ে রয়ে গেলেন।

 

উপসংহার

অধ্যবসায়ই মানুষকে পৃথিবীতে স্মরণীয় বরণীয় করতে পারে। তাই আমাদেরকে হতে হবে অধ্যবসায়ী। মোট কথা, যারা সংকল্পে অটল জীবন যাদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তাদের কাছে অসাধ্য কিছুই নেই। একমাত্র অধ্যবসায়ের গুণেই মানুষ নিজের জীবনকে সুষমামণ্ডিত করে দেশ ও জাতির নিকট স্মরণীয় বরণীয় হতে পারে। কাজেই আলস্য জড়তা ও ব্যর্থতার গ্লানি পরিত্যাগ করে আমাদের সকলকে হতে হবে অধ্যবসায়ী।


আরো দেখুন: [ সূচিপত্র : বাংরা প্রবন্ধ রচনা ]
রচনা : অধ্যবসায় (ছোট)
রচনা : অধ্যবসায় (২টি রচনা) – (Visit MAG + PDF)
রচনা : অধ্যবসায় (২৭ পয়েন্ট) – (Visit MAG + PDF)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *