গ্রাম্য মেলা
সূচনা
গ্রাম্য মেলা আনন্দ উচ্ছ্বাসের কেন্দ্র। গ্রামে বছরে এটি একবার অনুষ্ঠিত হয়। বাস্তবিকপক্ষে গ্রাম্য মেলা গ্রামবাসীদের নৈপুণ্যের প্রদর্শনী
কখন অনুষ্ঠিত হয়
সাধারণত শীতকালে গ্রাম্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নিমিত্ত গ্রীষ্মকালেও মেলা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সময় সময় ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসে।
বর্ণনা
শুধু গ্রাম্য মেলাই নয় বরং যে কোনো মেলাই খোলা জায়গায় হয়ে থাকে। ময়দান বাজার এবং মন্দিরের সামনে সাধারণত এক হতে সাত দিন মেলা স্থায়ী হয়। গ্রাম্য মেলায় রকমারি মিষ্টান্ন খেলনা আসবাব পত্র অলঙ্কার তৈরি সাজ পোশাক ইত্যাদি পাওয়া যায়। মেলায় অস্থায়ী দোকান সাজানো হয়। মেলায় সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় বস্তু হচ্ছে সার্কাস প্রদর্শনী নাগরদোলা ইত্যাদি। মেলায় নানা রকম জুয়া খেলার প্রলোভনও দেখানো হয়।
মেলার গুরুত্ব
মেলা শুধু গ্রামের মানুষের মনে আনন্দই দেয় না বরং এর গুরুত্বপূর্ণ দিকও আছে। গ্রামের মানুষ মেলা উপলক্ষে কুটির শিল্পজাত দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ কুটির শিল্পজাত দ্রব্যগুলো বিক্রি করে একশ্রেণির পেশাজীবী মানুষ মুনাফা পায়। শুধু কুটির শিল্পজাত দ্রব্য হয় নিত্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসপত্র ক্রেতা ও বিক্রেতারা ক্রয় বিক্রয় করে নিজেদের অভাব মিটায়। শিশুরা আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে। সে দিনটা তাদের নিকট হয় পরম আনন্দের দিন। এখানে আবাল বৃদ্ধ বনিতার সমাগম হয়। ফলে আদান প্রদান হয় নানা মনোভাবের।
উপকারিতা
গ্রাম্য মেলা গ্রামবাসীদের নৈপুণ্য প্রদর্শনের সুযোগ এনে দেয়। গ্রামীণ জীবন খানিকটা একঘেয়ে ও শোচনীয়। গ্রামা মেলা গ্রামীণ জীবনের একঘেঁয়েমি বিদূরিত করে এবং গ্রামবাসীদের হৃদয়কে আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে দেয়। এটি ছেলে মেয়েদের জন্যে অফুরন্ত আনন্দ সম্ভার নিয়ে আসে। তাই তারা একে মাত্রাতিরিক্ত পছন্দ করে।
অপকারিতা
গ্রাম্য মেলা আনন্দদায়ক হলেও একেবারে ত্রুটিমুক্ত নয়। মেলায় জুয়া খেলা যুবকদের চরিত্র বিনষ্ট করে ও তাদের বিপথগামী করে।
মেলার উপলক্ষ
যেকোনো মেলাই একটি বিশেষ উপলক্ষকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামে সাধারণত ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। পহেলা বৈশাখ রথযাত্রা জন্মাষ্টমী বিজয়া দশমী দশই মহররম চৈত্র সংক্রান্তি এসব উৎসবকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ মেলা বসে থাকে। তবে উপলক্ষ যাই হোক না কেন মেলা বাঙালি সমাজ সংস্কৃতি ও মানুষের নিকট খুব জনপ্রিয় ও আনন্দের দিন। বাংলাদেশে প্রচলিত মেলাগুলোর কোনোটি একদিন কোনোটি এক সপ্তাহ কোনোটি পনের দিন আবার কোনো কোনো মেলা এক মাসব্যাপী চলতে থাকে।
গ্রাম্য মেলার স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের মেলা বসে। মেলা বসার জন্য হাট বাজারের ন্যায় নির্দিষ্ট কোনো স্থান নির্ধারিত থাকে না। সাধারণত গ্রামের কেন্দ্রস্থলে খোলা মাঠে মন্দির প্রাঙ্গণে নদীর তীরে অথবা বটবৃক্ষের নিচে গ্রাম্য মেলা বসতে দেখা যায়। ঐতিহ্য অনুযায়ী এসব স্থানে মেলার আয়োজন করা হয়। মেলার স্থানে সাময়িকভাবে দোকানপাট বসার মতো চালা নির্মাণ করা হয়। মেলা শেষ হওয়ার পর এগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়। বছরের শেষে মেলার আনন্দে আবারও মুখরিত হয়ে ওঠে মেলার সে স্থান।
মেলার প্রস্তুতি
কোনো দিন মেলা বসবে তা এলাকার লোকেরা আগে থেকেই জানে এবং সে অনুসারে তাদের প্রস্তুতি চলে। গ্রামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা আগে থেকেই মেলায় খরচ করার জন্য তাদের পিতা মাতার নিকট থেকে টাকা পয়সা জমা করতে থাকে। এছাড়া আশপাশের কারিগরেরা মেলায় বিক্রির জন্য আগে থেকেই বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করতে থাকে।
গ্রাম্য মেলার বর্ণনা
গ্রাম্য মেলা একটি চিরন্তন ঐতিহ্য। এ মেলায় দূর দূরান্ত থেকে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী নিয়ে দোকানদাররা আসে। মেলায় দোকানগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকে। মেলায় কোথাও খেলনা কোথাও ডালা কুলা চালুনি কোথাও কাঠের জিনিসপত্র কোথাও মাটির জিনিসপত্র কোথাও ঘুড়ি এবং কোথাও খাবারের জিনিসের দোকান বসে। এছাড়া মেলার একপাশে নাগরদোলা ও সার্কাস বসে।কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে মেলায় হাজির হয়। কুটির শিল্পের অসংখ্য নমুনা এখানে আনা হয়ে থাকে। আশপাশের এলাকার বিভিন্ন শ্রেণির কারিগরেরা যেসব জিনিস তৈরি করে তা তারা বিক্রয়ের জন্য মেলায় নিয়ে আসে। এভাবে সুন্দর সুন্দর জিনিসের সমারোহে সারা মেলা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই সাথে থাকে মিষ্টি বিক্রয়ের আয়োজন। ছোট ছেলে মেয়েদের জন্য থাকে নানারকম খেলার জিনিস। তাদের মুখের বাঁশির শব্দে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। মেলা উপলক্ষে আরও বিচিত্র আনন্দের উপহার এখানে সমবেত হয়। ছোট ছেলেমেয়েরা সেসব আনন্দ উপভোগ করে থাকে। মেলায় কিছু খেলাধুলার প্রতিযোগিতাও চলে যা দর্শকদের বিশেষ আনন্দ দেয়।
মেলার তাৎপর্য
গ্রামীণ জীবনে মেলার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মেলা গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে অনাবিল আনন্দের উৎস হিসেবে উদ্যাপিত হয়। মেলা গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। গ্রামের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী নানা শিল্পসার মেলায় প্রদর্শিত হয়ে গ্রামীণ জীবনের ছবি স্পষ্ট করে তোলে। গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য রূপায়িত হয় গ্রাম্য মেলার মাধ্যমে। গ্রামের নানা খেলা ও আমোদ প্রমোদের উপকরণ দেখতে পাওয়া যায় গ্রাম্য মেলায়। গ্রামকে চেনা যায় গ্রাম্য মেলার মাধ্যমে।
মেলার আকর্ষণ
মেলায় আসা বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এ মেলা উপলক্ষে বিক্রেতারা তাদের বিচিত্র দ্রব্যের সমাবেশ ঘটায়। এখানে কুটির শিল্পজাত এবং মৃৎশিল্প তাল পাতার পাখা কাগজের তৈরি রকমারি খেলনা শীতল পাটি নকশি কাঁথা ইত্যাদি নানা সামগ্রীর সমাবেশ ঘটে। মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে বাঁশের বাঁশি চামড়ার ঢোল ইত্যাদি। এছাড়াও মেলায় উপভোগ করার মতো আছে সার্কাস ম্যাজিক যাত্রা থিয়েটার ইত্যাদি বিনোদনমূলক উপাদান ৷
উপসংহার
গ্রাম্য মেলা গ্রামীণ জীবনের আনন্দ উচ্ছ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই গ্রামবাসীরা সাগ্রহে এর জন্য প্রতীক্ষা করে। কিন্তু এটি একটি আইন সম্মত সংস্থার মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।