রচনা : সড়ক দুর্ঘটনা ও তার প্রতিকার [16 Points]

সড়ক দুর্ঘটনা ও তার প্রতিকার

ভূমিকা

বর্তমানে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি দৈনন্দিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই পাওয়া যায় হতাহতের খবর। শহর কিংবা শহরের বাইরে কোথাও যানবাহনে বা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া এখন মোটেই নিরাপদ নয়। বেপরোয়া গাড়ি কিংবা ঘাতক ট্রাক মুহূর্তে কেড়ে নেয় মানুষের প্রাণ। ঘর হতে বের হবার সময় মনে শঙ্কা জাগে আবার ঘরে ফেরা যাবে তো আবার পরিবার পরিজনের প্রিয়। মুখগুলো দেখতে পাওয়া যাবে তো এরূপ উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে মানুষ যে দিন কাটাচ্ছে তবু এর কোন প্রতিকার হচ্ছে না এবং সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

 

পথের সংখ্যা সীমিত

একদিন সভ্য মানুষগুলো শহরের গোড়াপত্তন করে। তারপর ধীরে ধীরে তার উপর দিয়ে বয়ে চলে সময়ের স্রোত। শহর সাজলো নতুন সাজে। তৈরি হলো নানা চেহারার রাস্তা। প্রাসাদের পর প্রাসাদ গড়ে উঠল। যানবাহনের পরিবর্তন হলো পালকি ছিল পালকি বিদায় নিল। বিদায় নিল ঘোড়ার গাড়ির চলন। এল বিদ্যুৎ, মোটর গাড়ি। দেখতে দেখতে শহর হলো কল্লোলিনী। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল কলেজ আরও কত কি হলো। গড়ে উঠল কলকারখানা। এলো স্বাধীনতা। সঙ্গে গ্রাম ত্যাগ। কাতারে কাতারে ছিন্নমূল মানুষ এসে ভিড় করল শহরে শহরের উপকণ্ঠে। যানবাহনের সংখ্যা বাড়ল। কিন্তু তার জন্য পরিকল্পিত পথ তৈরি হলো না। অতীত কৌলিণ্য নিয়ে যেসব পথ আজও টিকে আছে তাও সময়ের ভারে জরাজীর্ণ। সেই সংকীর্ণ পণের উপর যানবাহনের চাপ চলছে। চলছে জনতার জোয়ার।

 

দুর্ঘটনার চিত্র

সংবাদপত্রে যে খবরটি প্রতিদিনকার অনিবার্য বিষয়, তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার ফলে অকাল মৃত্যু। বছরে শত শত মানুষ প্রাণ হারায় গাড়ির তলায় পিষ্ট হয়ে। কোথাও বাসে ট্রাকে সংঘর্ষ। কোথাও মিনিবাস বাস কোথাও বাস ট্রাক রিকশা মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে এসে হাজির হয় পথচারীর সামনে। ছিনিয়ে নেয় কৃত অমূল্য জীবন। কোথাও রাস্তা পেরোতে গিয়ে প্রাণ হারায় পথের যাত্রী। কিন্তু কেন প্রতিদিনের এ মৃত্যুযজ্ঞ পথের দেবতার এ কেমন প্রাণ হরণের খেলা

 

দুর্ঘটনার কারণ

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ নানাবিধ। তবে বেপরোয়া গাড়ি চালনা এর প্রধান কারণ। অদক্ষ চালকরা অনেক সময় দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। গাড়ির ব্রেক নষ্ট হয়ে কোন কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটে। আবার অনেক সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এছাড়া যে সব কারণে সাধারণত ঘটে সেগুলো হল পথচারীদের নির্বিকারভাবে পথ চলা অসাবধানে রাস্তা পারাপার হওয়া মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালান ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা সামনের গাড়িকে কেটে আগে ওঠার প্রবণতা বেপরোভাবে দ্রুত গাড়ি চালানো পুরাতন ত্রুটিযুক্ত গাড়ি চলাচল ইত্যাদি। আবার বেশি আঁকাবাঁকা ও সংকীর্ণ সড়কও দুর্ঘনার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

 

প্রতিকার

সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। কেবলমাত্র কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই এর প্রতিকার সম্ভব। বাস ট্রাক চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা রোধের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও যানবাহন মালিক চালক ও শ্রমিকদের একগুঁয়েমি ধর্মঘট প্রভৃতি আইন প্রণয়ন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। এমন আইন করতে হবে যে গতি সীমিতকরণ যন্ত্রের সিল যাতে যাত্রীদের দেখার মত স্থানে লটকানো থাকে। চলাচলের অযোগ্য রাস্তাগুলো সংস্কার বা মেরামত করতে হবে। একথা অপ্রিয় হলেও সত্য যে যানবাহন চলাচলের নিয়ন্ত্রণের ভার পুলিশের উপর ন্যস্ত থাকলেও প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় পুলিশ যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে না। কেউ কেউ উৎকোচ গ্রহণ করে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়। এটা কঠোর হস্তে রোধ করতে। হবে।

 

জনগণের দায়িত্ব

দেশের জনগণ যদি সচেতন হয় তবে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা হ্রাস পেতে পারে। দুঃখের বিষয় আমাদের জনগণের বেশির ভাগই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। তাই দুর্ঘটনা সম্পর্কে তাদেরকে সচেতন করে তোলার জন্য মাঝে মাঝে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করা হয়। কিন্তু এর কার্যকারিতা সম্পর্কে জনগণ এখনো উদাসীন। জনগণের এ মন মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। এজন্য কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে যেমন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের নিকট দুর্ঘটনা এড়ানোর উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ম কানুন প্রচার ও প্রদর্শন করা জনসসমাবেশ করে ডকুমেন্টরি ছবি প্রদর্শন করা ইত্যাদি। জনগণ যদি ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলে যথেচ্ছভাবে রাস্তা পারাপার না করে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করে এবং সর্বোপরি পরিবহনজনিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় তবে দেশের সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

 

দুর্ঘটনার কারণ

দুর্ঘটনার কারণ একটি নয় একাধিক। বেপরোয়া গাড়ি চালানো এর একটি অন্যতম কারণ। অনেক সময় ড্রাইভারের লাইসেন্সও থাকে না। ড্রাইভার মদাপ হয়ে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারায় ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়াই গাড়ি নামায় পথে। বাসে বাসে মিনিবাসে মিনিবাসে কে কার আগে যাবে চলে তার প্রতিযোগিতা। যাত্রী বা পথচারীর দিকে তাকানোর তখন কোন ভ্রুক্ষেপ থাকে না অনেক সময় দুর্ঘটনা আরও বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়। অনেক সময় যাত্রী উঠানো নামানো গাফিলতির জন্য দুর্ঘটনা ঘটে। সিগন্যাল বাড়ি না মানা বা রাস্তার হলোদ লাইন অবাধে রুস করা বা শীত না মানা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। পথ অবরোধ পথসভা আগুন ইত্যাদির কারণেও যানজট হয়। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ তখন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। হকারদের ফুটপাত দখল আবার পথচারীদের পড়ে নামতে বাধ্য করে এবং দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

লোকসংখ্যা ও যানবাহন বনাম রাস্তা

স্বাধীন রাষ্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর বাংলাদেশের সড়ক পথের যথেষ্ট উন্নতি হলে ও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বর্তমানে বাংলাদেশে ২১ হাজার কিলোমিটার পাকা রাস্তা হয়েছে যার মধ্যে মাত্র ৪৮% হাইওয়ে সম্পন্ন । অপরদিকে এ দেশে শুধু মোটর যানবাহনের সংখ্যাই প্রায় ৬ লক্ষ । রিক্সা ভ্যান সাইকেল ঠেলা গাড়ি অটোরিক্সা ইত্যাদি অগণিত। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে উন্নত দেশের তুলনায় এগুলো আমাদের দেশে প্রায় ৩০ গুন বেশী। ফলে দেশের বৃহওম শহরগুলোতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্য বন্যার বেগে ছুটে আসা মানুষ আর যানবাহনের ভিড় ক্রমাগত বাড়ছে। শহর নগর বন্দর সবৃত্রই যেন ঠাঁই নেই অবস্থা। এ হিসেবে বাংলাদেশের সড়ক পথে অতিরিক্ত যানবাহনের ফলে দুর্ঘটনা হওয়া স্বাভাবিক।

 

ঢাকার চিত্র

ঢাকার বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি। আয়তনের তুলনায় একানকার লোকসংখ্যা বেশী। দুই দেড় কোটি লোকের তুলনায় এখানকার রাস্তা বা রাস্তার যানবাহন মোটেই পর্যাপ্ত নয়। যানবাহনের যেগুলো আছে সেগুলো বেশিরভাগই জরাজীর্ণ সংর্কীণ চলাচলের অযোগ্য বা নিরাপদ সড়ক গঠনের অন্তরায় । ফলে বাড়ছে অসংখ্য দূর্ঘটনা পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যা।

 

ঢাকার বাইরের চিত্র

তুলনামূলকভাবে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরের দুর্ঘটনা হার কিছুটা কম। দূর পাল্লার বাস ট্রাকই মূলত ট্রাকই এক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হয়। অনেক সময় ফেরিতে উঠতে গিয়ে বা নিয়ন্ত্রন হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছে ধাক্কা খেয়ে অথবা প্রতিযোগিতামূলক ভাবে কোনো গাড়িকে অবাকটেক করতে গিয়ে সংঘটিত অসংখ্যা দুর্ঘটনা অকালে অনেকের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।

 

সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি

সড়ক দুর্ঘটনা শুধু মানুষের জীবন সংহারই নয় বরং আর ও অনেক অপূরণীয় ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া মানুষের জীবনে । সড়ক দুর্ঘটনা আহত হয়ে অনেকে প্রাণে বেঁচে যায় বটে কিন্তু জীবনের স্বাভাবিক গতি তারা হারিয়ে ফেলে তারা চিরদিনের মতো ।পঙ্গুত্ব শারীরিক বৈকল্য আর যন্ত্রণা আর আসহ্য ভার বহন করে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে কম নয় । বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের, যানবাহনের ও সমাজের যে সূদুরপ্রসারী ক্ষতি হয় তার আর্থিক হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।

 

সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের ক্ষয়ক্ষতি

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু মারা যায়। আর আহত হয় হাজার হাজার শিশু যাদের বয়স ১৫ বছরের নিচে। ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৯৬ শতাংশ শিশু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ।

 

সড়ক দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয় তার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির দুই ভাগ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর হিসাব মতে আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে এর পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

 

সড়ক দুর্ঘটনায় পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতি

সড়ক দুর্ঘটনা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এর ফলে হঠাৎ করে বিপর্যয় নেমে আসে একটি পরিবারে। সেই শোক গোটা পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের বুকে শেলের মতো বিধে থাকে সারা জীবন। অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনায় সমাজ ও দেশ হারায় তার কৃতি সন্তানদের। এ দুর্ঘটনা অনেককে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে দেয়।

 

সড়ক নিরাপত্তা ও সরকার

সরকার সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান করে। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোট অথরিটি (বিআরটিএ) গঠন করা হয়। এর আগে সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ১৯৬১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) গঠিত হয়। এছাড়া গঠিত হয়েছে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড (ডিটিসিবি) এসব সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ গঠন করে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করে চলেছে। এছাড়া এর পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দুর্ঘটনা রিসার্চ সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। দেশের সড়ক বা মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ২০০৫ সালের ১১ জুন দেশের হাইওয়ে সড়কগুলিতে হাইওয়ে পুলিশ নিযুক্ত করা রয়েছে। সরকার এবং এসব সংস্থা যদি সর্বদা সতর্ক থাকে তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাংলাদেশ অবশ্যই এগিয়ে যাবে।

 

উপসংহার

দুর্ঘটনা কারো কাম্য নয়। এর ফলে কত প্রাণ যে অকালে ঝরে যাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। স্বজনহারার আহাজারীতে বাংলার আকাশ বাতাস আজ ভারী হয়ে উঠেছে। সবাই আতঙ্কিত অথচ এর কোন প্রতিকার হচ্ছে না। এ অবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন প্রয়োজন। তাই জনগণ এবং বিশেষ করে যানবাহন চালকদের মধ্যে সুবিবেক জাগ্রত হোক এটাই সবার প্রত্যাশা। তবে একথা ঠিক যে চালক কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে কোন দুর্ঘটনা ঘটাতে চান না অধিকাংশ চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হয়ে থাকে। দুর্ঘটনার মূল কারণ আকস্মিক যা চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হয়ে থাকে।


Leave a Reply

Your email address will not be published.