রচনা : শৈশবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

শৈশবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

এই বাংলার আকাশ বাতাস
সাগর গিরি ও নদী
ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু
আবার আসিতে যদি……. সুফিয়া কামাল

স্মরণকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির ইতিহাসে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি যুগান্তকারী নাম। বাঙালি জাতির এই প্রাণ পুরুষ ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শেখ লুৎফর রহমান, মাতা সায়েরা খাতুন।

মধুমতি আর ঘাগোর নদীর তীরে এবং হাওড়-বাঁওড়ের মিলনে গড়ে ওঠা বাংলার অবারিত প্রাকৃতিক পরিবেশে টুঙ্গিপাড়া গ্রামটি অবস্থিত। আজ থেকে ছয়’শ বছর আগে কবিরত্ন বিজয় গুপ্ত তাঁর পদ্মপুরাণ কাব্যে এই ঘাগোর নদীর ঐতিহাসিক বর্ণনা দিয়ে গেছেন। টুঙ্গিপাড়া গ্রামের সারি সারি গাছগুলো ছিলো ছবির মতো সাজানো। নদীতে তখন বড়ো বড়ো পালতোলা পানশি, কেরায়া নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার চলতো। বর্ষায় গ্রামটিকে মনে হতো যেন শিল্পীর আঁকা জলে ডোবা একখন্ড ছবি।

টুঙ্গিপাড়া তখনো অপরিচিত এলাকা। দু’একটি বনেদি পরিবার এখানে বসবাস শুরু করে। টুঙ্গিপাড়ার একটি বনেদি পরিবারের নাম শেখ পরিবার। এই পরিবারের উত্তরসূরি শেখ পরিবারের সুপরিচিত ব্যক্তি শেখ হামিদ গড়ে তোলেন একটি টিনের ঘর। শেখ হামিদের একমাত্র পুত্র শেখ লুৎফর রহমান একহন সজ্জন ব্যক্রি। গোপালগঞ্জ শহরে সবেমাত্র সরকারি চাকরি গ্রহণ করেছেন। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ, এদিন শেখ লুৎফর রহমান ও তার সহধর্মিণী সায়েরা খাতুনের ঘরে জন্ম নিলো একটি ফুটফুটে চেহারার শিশু। বাবা-মা আদর করে নাম রাখলেন খোকা। এই খোকাই হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতির জনক এবং সমগ্র বাংলার প্রিয় মানুষ। শৈশব-কৈশোরে বাবা-মা তাঁকে আদর করে খোকা বলে ডাকতেন।

বঙ্গবন্ধুর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সুষমামন্ডিত টুঙ্গিপাড়ায়। টুঙ্গিপাড়া গ্রামেই শেখ মুজিবুর রহমান ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা শস্য শ্যামলা রূপসি বাংলাকে দেখেছেন। তিনি আবহমান বাংলার আলো-বাতাসে লালিত ও বর্ধিত হয়েছেন। তিনি দোয়েল ও বাবুই পাখি ভীষণ ভালোবাসতেন, বাড়িতে শালিক ও ময়না পুষতেন। আবার নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটতেন। বানর ও কুকুর পুষতেন বোনদের নিয়ে। পাখি আর জীবজন্তুর প্রতি ছিল গভীর মমতা। ফুটবল ছিল তার প্রিয় খেলা। তিনি শাশ্বত গ্রামীণ সমাজের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ছেলেবেলা থেকে গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন।

টুঙ্গিপাড়ার সেই শেখ বাড়ির দক্ষিণে ছিল কাছারি ঘর। এখানে মাস্টার, পন্ডিত ও মৌলভি সাহেবদের কাছে ছোট্ট মুজিবের হাতেখড়ি। একটু বড়ো হলে তাঁদের পূর্বপুরুষদের গড়া গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর লেখাপড়া শুরু হয়। এরপর তিনি বাবার কর্মস্থল গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে পড়াশোনা করেন। ১৯৪২ সালে মেট্রিক এবং ১৯৪৭ সালে কলকাতার অধীনস্থ ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। এ সময়ে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামী অধ্যায়। শৈশব থেকেই তিনি খুব অধিকার সচেতন ছিলেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হামিদ মাস্টার ছিলেন তাঁর গৃহশিক্ষক। তাঁর এক স্যার তখন গরিব ও মেধাবী ছাত্রদের সাহায্য করার জন্য একটি সংগঠন করেছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই সংগঠনের প্রধান কর্মী। বাড়ি বাড়ি ধান-চাল সংগ্রহ করে ছাত্রদের সাহায্য করেছেন। একবার অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক গোপালগঞ্জ পরিদর্শনে আসেন। সাহসী কিশোর মুজিব সেবার স্কুল ঘর মেরামত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার আদায় করেন। এর কিছুদিন পর গোপালগঞ্জে সরকার সমর্থকদের দ্বারা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে জীবনে প্রথম গ্রেফতার হন। এরপরেও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রামে কখনো আপোষ না করার অনেকবার কারাবরণ করেন।

বঙ্গবন্ধু ছোটোদেরকে ভীষণ ভালোবাসতেন। কচিকাঁচার মেলা ও খেলাঘর ছিলো তাঁর প্রিয় সংগঠন। কৈশোরে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কচিকাঁচার আসরে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের শেষ দিনটি তিনি কাটিয়েছেন এই সংগঠনের ভাই-বোনদের মাঝে। তাঁর জন্মদিনকে এখন আমরা জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করি। শিশুদের কাছে দিনটি আনন্দ-খুশির।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় লাভের পর পাকিস্থানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ ভূমিতে ফিরে এসে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় আত্মনিয়োগ করেন। স্বাধীন ও সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশে তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর বেঁচে ছিলেন। মানবতার শত্রু কতিপয় বিপথগামী ঘৃণ্য ঘাতকের দল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নামই নয়, একটি দেশের, একটি জাতির রূপকার। যার নেতৃত্বে, যার অসীম ত্যাগ প সংগ্রামে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। তিনি ছিলেন নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের প্রকৃত বন্ধু। অপরিসীম দরদ ও ভালোবাসা ছিল তাঁর বাংলার জনগণের জন্য। পরিবার-পরিজনসহ নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের কত আপন ছিলেন। স্বাধীনতা লাভের পর টুঙ্গিপাড়াকে পৃথক থানা ঘোষণা করা হয়। গোপালগঞ্জের এই সবুজ শ্যামল টুঙ্গিপাড়াতেই এখন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আমাদের সেই খোকা।


আরো দেখুন (বাংলা প্রবন্ধ রচনা) :

Leave a Reply

Your email address will not be published.