রচনা : শাপলা : বাংলাদেশের জাতীয় ফুল

বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা

সূচনা

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ফুলের অবদান রয়েছে। অন্যান্য ফুলের মতো শাপলা সে সৌন্দর্যের অংশীদার। শাপলা বাংলাদেশের সব অঞ্চলে সহজে পাওয়া যায়। শাপলা ফুলের সৌন্দর্য বাংলাদেশের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবেচনায় ও খুব সহজেই পাওয়া যায় বলে শাপলা জাতীয় ফুলের মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের জাতীয় ফুল শাপলার মতো অন্যান্য দেশেও জাতীয় ফুল রয়েছে। যেমন ভারতের জাতীয় ফুল পদ্ম ইরানের জাতীয় ফুল গোলাপ ইত্যাদি।

 

প্রাপ্তিস্থান

শাপলা জলে জন্মে বলেই এটি জলজ ফুল খালে বিলে হাওড়ে বাঁওড়ে ঝিলে পুকুরে নদীতে পরিত্যক্ত জলাশয়ে এ ফুল জন্মে। এ ফুল চাষাবাদ করতে হয় না। বিনা যত্নেই ফুটে থাকে।

 

কখন ফোটে

ভাদ্র-আশ্বিন মাসে বর্ষার সময় শাপলার অঙ্কুর মাটি থেকে গজিয়ে ওঠে। এ ভাসমান অবস্থায় পানির ওপরে ফুল ফোটে। শাপলা ফুল ঝরে যাওয়ার সময় ফুলের ডিম্বকোষ অংশের মধ্যে বীজগুলো পেকে ফেটে যায় এবং বীজগুলো পানির ওপর ভাসতে থাকে। পানি শুকিয়ে গেলে বীজগুলো মাটিতে মিশে যায় এবং বর্ষাকালে নতুন লতা জন্মে। মূল অংশ মাটির মধ্যে আবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে। একে শালুক বলা হয়। শালুক হতে আবার নতুন গাছ জন্মে।

 

কোথায় ফোটে / কোথায় পাওয়া যায়

বদ্ধ পানিতেই শাপলা ফুলের জন্ম ও বৃদ্ধি। বাংলাদেশের জলাভূমি অগভীর বিল পুকুর প্রভৃতি স্থানে শাপলা ফুল প্রচুর পরিমাণে জন্মে। এর চাষ করতে হয় না।

 

আকার-আকৃতি

শাপলা ফুল গোলাকৃতির হয়। মাটির মূল অংশ থেকে শাপলার দত্ত বের হয়ে পানির ওপর পাতা মেলেভাসতে থাকে। ভাটার দৈর্ঘ্য ১২- ১৩ ইঞ্চি হয়ে থাকে। পাতাগুলো গোলাকার। পাপড়িগুলো বিচ্ছিন্ন।

 

জাতীয় জীবনে ব্যবহার

জাতীয় জীবনে এর অনেক ব্যবহারিক দিক রয়েছে। ডাকটিকিট ও মুদ্রায় শাপলার ছাপচিত্রের ব্যবহার আছে। জাতীয় প্রতীকের মর্যাদাও পেয়েছে এ ফুল।

 

প্রকারভেদ

রঙের বিবেচনায় শাপলার রয়েছে রকমফের। শাপলা সাদা লাল নীল হলুদ কালচে লাল বেগুনি লাল রক্ত বেগুনি নীল বেগুনি প্রভৃতি রঙের হয়ে থাকে। বাংলাদেশে সাদ লাল ও নীল এই তিন রঙের শাপলা পাওয়া যায়। অন্যান্য রঙের শাপলার তুলনায় সাদা শাপলা বেশি পাওয়া যায়। আমাদের জাতীয় ফুল সাদা শাপলা।

 

পরিচয়

পানির নিচের মাটি থেকে প্রথমে মূল বা শিকড় গজায়। আর সে-শিকড় থেকে সরু নলের মতো একটি দণ্ড পানি ভেদ করে উপরে উঠে আসে এবং পানির উপরে সে-দগুটি থেকে পাতা বের হয়। পাতা বড় ও পুরু হয়ে পানির উপরে ভাসে। আর মূল থেকে একাধিক শাখা বের হয় যা দেখতে অনেকটা ঝাড়ের মতো। একাধিক শাখাই মূলত শাপলার নল বা ডাঁটা। এসব নলের মাথায় কলার মুচির আকৃতির ফুলের কুঁড়ি ফোটে। ফুলগুলোও পাতার মতো পানির উপরে ভাসে। শাপলা ফোটে বর্ষাকালে। শাপলা ফুলের মেলায় প্রকৃতিকে অপরূপ সাজে সজ্জিত হতে দেখা যায়।শাপলা পরিপূর্ণভাবে ফোটার সাথে সাথে পাপড়িগুলো ঝরে পড়ে আর নলের আগায় গোলাকার বিচিটি পানিতে ডুবে যায়। পানি বাড়ার সাথে সাথে শাপলার বৃদ্ধি ঘটে। আর পানি কমার সাথে সাথে নিশ্চিহ্ন হতে থাকে। শীত মৌসুমে খালে বিলে নদী নালায় পানি না থাকার কারণে শাপলা মরে যায়। তবে বিচিগুলো সুপ্ত অবস্থায় থাকে। নতুন বর্ষার আগমনে শাপলাগুলোর শিকড় থেকে আবার চারা গজায়।

 

বর্ণনা

শাপলা লতাগুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। জলে জন্মে বলে একে জলজ উদ্ভিদও বলা হয়ে থাকে। শাপলা স্রোতবিহীন জলাশয়েই সাধারণত জম্নে থাকে। এর মূল থাকে জলাশয়ের নিচে কাদায়। জলাশয়ের পানি যতই বাড়তে থাকে এর ডাঁটাও তত বাড়ে। এর পাতা গোলাকৃতির ও বড় বড়। থালার মতেরা মসৃণ পাতাগুলো পানির উপর ভাসতে থাকে। এক একটি গাছে অনেকগুলো পাতা জন্মে থাকে। পানির নিচে গাছের গোড়া থেকে নল বের হয়ে এবং তা বৃদ্ধি পেয়ে এক সময় পানির উপর ভেসে ওঠে। কুঁড়ি অবস্থায় শাপলা দেখতে অনেকটা কলার মোচার মতো। প্রথমে এ কুঁড়িটি আস্তে আস্তে ফুটতে থাকে এবং দুএকদিনের মধ্যেই তা সম্পূর্ণ ফুটে যায়।

শাপলা ফুলের রং বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কোনোটা সাদা কোনোটা লাল আবার কোনোটা বেগুনি রঙেরও হয়ে থাকে। তবে সাদা রঙের ফুলই আমাদের দেশের জাতীয় প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শাপলা ফুল থেকে আলুর মতো বড় বড় ফল হয়। একে আমরা ভাট বলে থাকি। গ্রামের মানুষ এ ভাট থেকে খৈ ও মোয়া তৈরি করে।

 

সৌন্দর্য

বর্ষার জলে শাপলা ফোটার সাথে সাথে প্রকৃতি ধরা দেয় নবরূপে। শাপলার সৌন্দর্য এমনভাবে ফুটে ওঠে । প্রকৃতিকে অপরূপ বলে মনে হয়। জ্যোৎস্নারাতে নানা রঙের শাপলা রাতের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে।

 

শাপলা কেন জাতীয় ফুল

শাপলা বাংলাদেশের নদ নদী খাল বিল হাওড় বাঁওড় ডোবা পুকুর প্রভৃতির আনাচে কানাচে এত বেশি ফুটে থাকে যে এ ফুলের মতো আর কোনো ফুল বাঙালিদের সান্নিধ্যে আসতে পারেনি। সেজন্যই শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। তা ছাড়া শাপলাই একমাত্র ফুল যা বিশ্বের আর কোনো দেশে আমাদের দেশের মতো দেখা যায় না।

 

শাপলা ফুলের রূপ

শাপলা সাধারণত বর্ষাকালে ফোটে। বর্ষাকালে বাংলাদেশের মাঠ ঘাট নদী নালা খাল বিল পুকুর দিঘি প্রভৃতি যখন পানিতে ভরে যায় তখন চারদিক শোভিত করে শাপলা ফুল ফোটে। চারদিক বিস্তৃত জলাশয়ে যখন শাপলা ফুল ফোটে তখন এক অপরূপ দৃশ্যের সূচনা হয়। জোছনারাতের স্নিগ্ধ আভার সাথে শাপলার হাসি আর মৃদুমন্দ বাতাসের দোলায় টলমল পানিতে তার রূপ সত্যিই মনোমুদ্ধকর। এসময় মনে হয় যেন আকাশের অসংখ্য তারা জলাশয়ে নেমে এসে হাসির ফোয়ারা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ দৃশ্য যেন কিছুতেই ভোলা যায় না।

 

উৎপত্তি ও গঠন

বিনা পরিশ্রমে প্রাকৃতিক নিয়মে পুকুর দিঘি খালবিল ও ডোবায় শাপলা জন্মে। বর্ষার মাঝামাঝি থেকে শুরু করে শরৎকাল শেষ হওয়া পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে শাপলা বেশি ফুটতে দেখা যায়। লম্বা লকলকে কাণ্ডের মাথায় শাপলাফুল ফোঁটে। এ ফুলে থাকে চারটি বৃতি বেড়া পনেরটি উপবৃতি একগুচ্ছ দল পুংকেশর স্ত্রিকেশর গর্ভদণ্ড ও গর্ভমুণ্ড। শ্বেতপাপড়ি ও সামান্য হলদে দলমণ্ডল ফুলকে খুব আকর্ষণীয় করে তোলে।

 

উপকারিতা

শাপলা সৌন্দর্য বাড়ায়। শিশু কিশোররা শাপলা ফুল হাতে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করে। তারা শাপলার নল দিয়ে মালা গাঁথে। এর নল বা ডাঁটা তরকারি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শাপলার বিচি থেকে খৈ হয়। তা ছাড়া শাপলা থেকে যে শালুক হয় তা শুকিয়ে খাওয়া যায়।

 

অপকারিতা

শাপলা অনেক সময় ধানখেতের ক্ষতি করে থাকে। ধানের চারার সঙ্গে শাপলার চারা বাড়লে ধানগাছ বাড়তে পারে না।

 

উপসংহার

বাংলাদেশের অধিকাংশই জলজ অঞ্চল। বর্ষাকালে তার সম্পূর্ণ রূপ আমরা দেখতে পাই। আর বর্ষাকালে শাপলা জলজ ফুল হিসেবে প্রকৃতির শোভাবর্ধন করে। এর স্বাভাবিক সৌন্দর্য বাঙালির লোকজীবনে জাতীয় জীবনে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শাপলা ফুলের তুলনা হয় না।


আরো দেখুন (প্রবন্ধ রচনা) :

Leave a Reply

Your email address will not be published.