কর্তৃত্ববাদী মুদ্রা ডলার

বর্তমান বিশ্বমুদ্রা ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি ডলার। বিশ্ব বাণিজ্যের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রিত হয় মার্কিন ডলারের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বৃহৎ আকারের জন্য এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে স্থায়ী মুদ্রাও মনে করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে। ফলে বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে ডলারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে টাকার মান।

 

ডলার

‘ডলার’ (Dollar) শব্দটির উৎপত্তি মধ্যযুগীয় ইউরোপে। ইউরোপের দেশগুলো দ্রুত অর্থ প্রদানের একটি আন্তর্জাতিক উপায় হিসেবে এর উৎপত্তি ঘটায় এবং প্রতিটি ইউরোপীয় জাতি তাদের নিজস্ব ভাষা-বান্ধব নাম দেয়। ইংল্যান্ড প্রথম এটাকে ‘ডালার’ বলতো এবং পরবর্তীতে এটি ‘ডলার’ শব্দে রূপান্তরিত হয়।

 

প্রতীক $

ষোড়শ শতাব্দীতে স্পেন অধিক মাত্রায় রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন করে, যাকে তাদের ভাষায় Peso de Ocho বা সংক্ষেপে Peso বলা হতো, যার অর্থ আট খন্ড। Peso চালু করার সময় ইউরোপে রুপার সরবরাহ কমতে শুরু করে। ফলে এ স্পেনীয় মুদ্রা পেসো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাথমিক মুদ্রায় পরিণত হয়। স্পেনীয় পেসোর আগে আরেকটি মুদ্রার বেশ সুখ্যাতি ছিল, যার নাম Joachimsthaler। সংক্ষেপে একে ডাকা হয় ‘থেলার’ নামে। আর এখান থেকেই আসে ‘ডলার’ শব্দটি। ব্যবসায়ীরা লেনদেনের হিসাব সহজভাবে লেখার জন্য পেসো শব্দটির সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করতে শুরু করে। এ জন্য P বর্ণের ওপরের দিকে S বর্ণ বসিয়ে একটি প্রতীক তৈরি করা হয়। একসময় প্রতীকটি বেশি ব্যবহারের ফলে P ও S মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ফলে S বর্ণের সঙ্গে P বর্ণের শুধু উল্লম্ব রেখাটি টিকে থাকে। যা দেখতে বর্তমান ডলার প্রতীকের মতোই। ১৭৭০ সালে ডলারের প্রতীকটি প্রথমবারের মতো কোনো নথিতে লিপিবদ্ধ হয়। তখনো কিন্তু দেশটির নাম যুক্তরাষ্ট্র হয়নি।

 

ডলারের আধিপত্যের বিস্তার

বহু বছর ধরে পৃথিবীতে স্বর্ণের মানে ওপর নির্ধারিত হতো অর্থনীতি ও লেনদেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক এবং অন্যান্য সরঞ্জাম স্বর্ণের মাধ্যমে বিক্রি করায় বিশ্বের মোট রিজার্ভের ৭০% স্বর্ণ চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ইউরোপ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত। যেহেতু তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল এবং স্বর্ণের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন ডলার স্থিতিশীল ছিল সেহেতু আর্থিক ব্যবস্থার রূপরেখা কেমন হবে, এ নিয়ে ১-২২ জুলাই ১৯৪৪ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের শহর ব্রেটন উডসে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী মিত্রশক্তির ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেয়। তীব্র মতানৈক্যের পর যে রূপরেখাটি চূড়ান্ত হয়, তার নাম ছিল ব্রেটন উডস ফাইনাল অ্যাক্ট। মূলত ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৬ মার্কিন ডলারের বিনিময় হারকেই সকল সদস্যদেশ তাদের প্রথমিক পার ভ্যালু হিসেবে বেছে নেয়। ব্রেটন উডস অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে ডলারকে ৪৪টি দেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে রাখতে একমত হয়। সেই থেকে ডলারের আধিপত্য শুরু। ৩৭তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। ১৫ আগস্ট ১৯৭১ মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ব্রেটন উডস ব্যবস্থা বাতিল করে দিলে নতুন সংকট তৈরি হয়। যে যার মতো করে বিনিময় ব্যবস্থা অনুসরণ করা শুরু করে, বিশ্ব যাত্রা শুরু করে ফ্লোটিং (Floating) বা ভাসমান বিনিময় হারের দিকে। মার্কিন ডলার স্বর্ণে রূপান্তরের ক্ষমতা বাতিল করার এ পদক্ষেপকে বলা হয় Gold Window বন্ধ করা, যাকে অনেকে Nixon Shock বলে থাকেন। বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে এবং চাহিদা বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সাথে একটি চুক্তি করে। এ চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরবকে বাধ্য করা হয় ডলারকে সার্বভৌম বিশ্বমুদ্রা হিসেবে মেনে নিতে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি বাদশাহকে গ্যারান্টি দেয় যে, যতদিন তারা পেট্রো ডলার চুক্তি মেনে চলবে ততদিন সৌদি রাজ পরিবার ক্ষমতায় থাকবে। সৌদি বাদশাহদের ক্ষমতায় থাকতে আরও একটি শর্ত দেয়, তা হলো, OPEC ভুক্ত সকল দেশকে রাজি করানো যাতে ডলার ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রা বা স্বর্ণের বিনিময়ে তেল বিক্রি না করে।

 

গ্রিনব্যাক (Greenback)

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় দেশটিতে জরুরি কাগজের মুদ্রা প্রচলন করা হয়। মুদ্রার পিছনে সবুজ রঙ মুদ্রিত হয় বলে তা গ্রিনব্যাক (Greenback) বা গ্রিন মানি (Green Money) নামে পরিচিতি লাভ করে। ১০ মার্চ ১৮৬২ প্রথম জরুরি কাগজের মুদ্রা ইস্যু করা হয়।

 

বিবিধ তথ্য

  • ব্রিটিশ পাউন্ড তার আধিপত্য হারায় ১৯২০ সালে
  • মার্কিন ডলার ও পাউন্ডকে দুর্লভ মুদ্রা বলে
  • মুদ্রার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি কুয়েতি দিনার
  • বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রিত ভাসমান বা ফ্লোটিং বিনিময় মুদ্রা নীতির প্রচলন করে ১৯৭৬ সালে
  • বাংলাদেশ মধ্যবর্তী মুদ্রা হিসেবে পাউন্ডের পরিবর্তে মার্কিন ডলারকে বেছে নেয় ১৯৮৩ সালে
  • বাংলাদেশি মুদ্রাকে চলতি হিসাবে রূপান্তরযোগ্য করা হয় ১৭ জুলাই ১৯৯৩
  • বাংলাদেশের মুদ্রা টাকাকে ফ্লোটিং (Floating) বা ভাসমান ঘোষণা করা হয় ২০০৩ সালে
  • বাংলাদেশে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাকার অবমূল্যায়ন হয় ১৭ মে ১৯৭৫
  • ১৯৭১ সালে প্রতি ১ ডলারের মান ছিল ৭.৩০ টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published.