রচনা : বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ [16 পয়েন্ট]

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ

ভূমিকা

বাংলাদেশ একটি প্রাচীন দেশ। প্রাচীনত্বের গরিমায় বাংলা সারা বিশ্বে পরিচিত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজা বাদশাহর পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি দারুণভাবে উন্নতি লাভ করেছে। দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিদেশে পর্যটকদের আকর্ষণ করে দেশের জন্য আর্থিক সমৃদ্ধি আনয়ন করেছে। বর্তমানে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা বর্তমান।

 

বাংলাদেশের পর্যটন স্থান

নীচে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থানগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো-

১। কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত : বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকতের অবস্থান বাংলাদেশের কক্সবাজারে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। আরও রয়েছে দক্ষিণ অঞ্চলের কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। যেখান থেকে দেখা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য।

২। সেন্টমার্টিন : আমাদের আছে জগদ্বিখ্যাত প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রবালদ্বীপের নামই সেন্টমার্টিন। নারকেল গাছে ঘেরা যার সৈকত। এর আরেক নাম নারিকেল জিঞ্জিরা।

৩। রাঙামাটি ও বান্দরবান : পাহাড়-পর্বত ঘেরা বান্দরবান, রাঙামাটির সবুজ বনানীতে অপরূপ সৌন্দর্য সহসাই মনকে আকৃষ্ট করে। ছোটবড় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদী, ঝরনা আন হ্রদের অপার নান্দনিকতা যেকোনো মানুষকে বার বার হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাহাড়ি উপজাতিদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার বর্ণাঢ্য রূপ মুগ্ধ করে পর্যটন প্রিয়দের।

৪। সুন্দরবন : বাংলাদেশেই অবস্থিত পৃথিবীর বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন যার নাম সুন্দরবন। খাল, নদী, সাগর দ্বারা বেষ্টিত সুন্দরবনের জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘ। সে বাঘ ভুবন বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামে অভিহিত। সুন্দরবনে অবস্থানকালে পর্যটকদের ঘুম ভাঙবে অগণিত পাখির কলকলানিতে যা একজন পর্যটককে স্বপ্নিল আবেশে মুগ্ধ করতে পারে।

৫। চা বাগান ও জলপ্রপাত : সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলোও বেশ সৌন্দর্যমন্ডিত। যা পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। জাফলংয়ের জলপ্রপাত, ছাতকের পাথর কেয়ারী নয়নভোলানো স্থান। এছাড়া তামাবিল, চট্টগ্রামে ফয়েজ লেক, বঙ্গবন্ধু সেতু ইত্যাদি পর্যটনের স্থান হিসেবে বেশ সমাদৃত।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্প নানাভাবে অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশের এমনিতেই রপ্তানি কম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কোনো খাতই তেমন শক্তিশালী নয়। এই প্রেক্ষাপটে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে পর্যটনের মতো ‘অদৃশ্য রপ্তানি পণ্য’ খাতে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারে। পর্যটন শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিরাজমান সমস্যাগুলো হলো-

১। অবকাঠামোগত দুর্বলতা : এই খাতের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে দুর্বল। পরিবহণ ব্যবস্থা মান্ধাতার আমলের। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সত্ত্বেও এখনও রয়েছে অনেক দুর্বলতা। রাস্তাঘাট সংকীর্ণ, অনেক জায়গায় বিপজ্জনক। প্রায়শই যানজটে অযথা সময় ও শক্তি নষ্ট হয়। পর্যাপ্ত আধুনিক হোটেল ও মোটেল নেই। পর্যটন কেন্দ্রগুলোও অবহেলিত। এগুলোর সুপরিকল্পিত আধুনিকায়ন ও শুল্কমুক্ত বিপণির অভাবও এক্ষেত্রে বড় বাধা।

২। রাজনৈতিক অস্থিরতা : দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে বড় সমস্যা হয়ে থাকছে। ঘন ঘন হরতাল, যখন তখন যথেষ্ট ভাঙচুরের কারণে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয় এবং পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ফলে বিদেশি পর্যটকরা এদেশে ভ্রমণে বিশেষ উৎসাহ বোধ করেন না।

৩। উন্নত সেবা ও তথ্যের অভাব : দক্ষ, মার্জিত জনবলের অভাব শিল্পের একটা বড় সমস্যা। সেই সঙ্গে রয়েছে উন্নত ও দ্রুত তথ্য আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থার অভাব।

৪। সামাজিক বাধা : বিদেশি পর্যটকদের সাংস্কৃতিকে এদেশে অনেকেই সহজ ও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন না। অনেকেই তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অনেকেই তাদের সম্পর্কে পোষণ করেন নেতিবাচক মনোভাব। অনেক সময় পর্যটকরা দুষ্টলোকের পাল্লায় পড়ে ক্ষতিগ্রস্থও হন। এগুলোও এ শিল্পের বিকাশে সমস্যা হয়ে আছে।

৫। প্রচারের অভাব : আজকে আমরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, বিবিসি, সিএনএন, ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফির মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যসহ প্রাকৃতিক রূপ অবলোকন করে থাকি। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তেমন কোনো প্রচার নেই বললেই চলে।

৬। নিরাপত্তার অভাব : রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, চুরি, ছিনতাই, হত্যা, রাহাজানি, সহিংসতা, পর্যটকদের চলাফেরার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক।

 

পর্যটন শিল্প বিকাশে করণীয়

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ অত্যান্ত সম্ভাবনাময়। এই শিল্পের বিকাশে প্রথমেই সচেষ্ট হতে হবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠায়। পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য চাই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কার। চাই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। আকর্ষণীয় এলাকাগুলোর পরিকল্পিত নান্দনিক উন্নয়ন যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন পর্যটন কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। পর্যটন সংক্রান্ত নানা বিষয়ে প্রয়োজন তথ্যপূর্ণ আকর্ষণীয় প্রচার। এই শিল্পের বিকাশের জন্য পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে পর্যটকদের নিরাপত্তা। বিভিন্ন দেশের মতো পর্যটকদের বাড়তি সুবিধা দিতে হবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করতে হবে। সৈকতে রাখতে হবে বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা, ব্যবহার করতে হবে আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি। প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থানসহ অন্যান্য দৃষ্টিনন্দন স্থানকে পর্যটনের আওতায় এনে সমৃদ্ধ করতে হবে।

 

উপসংহার

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আরো উন্নত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ৭ম শতকে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন-সাং বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। এই উচ্ছ্বসিত প্রশংসাকে সর্বদা ধরে রাখার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশের দায়িত্ব আমাদের। সরকারের পাশাপাশি আমরা বেসরকারি উদ্যোগে বিকাশ ঘটাতে পারি পর্যটন শিল্পের। আমরা সম্মিলিতভাবে যদি প্রচেষ্টা চালাই তাহলে অচিরেই পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিবে।


আরো দেখুন (বাংলা প্রবন্ধ রচনা) :

Leave a Reply

Your email address will not be published.